# ফুটপাত দখলের আড়ালে বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার অবৈধ অর্থনীতি

- Link: https://www.cholomansongbad.com/%e0%a6%ab%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a4-%e0%a6%a6%e0%a6%96%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%9b%e0%a6%b0%e0%a7%87/
- Published: ২০২৬-১০-৩০T১৭:১২:১৮+০৬:০০
- Author: শাহিন মোল্লা

বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানী ঢাকার ফুটপাত দখলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিপুল অর্থের অবৈধ
বাণিজ্য। পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য নির্মিত এসব ফুটপাতের বড় অংশ এখন হকারদের
দখলে। আর এই দখলকে পুঁজি করে সক্রিয় রয়েছে চাঁদাবাজদের সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশ
হকার্স ফেডারেশনের তথ্য এবং বিভিন্ন গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ 
সিটি করপোরেশনের ফুটপাত থেকে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। বিপুল
অঙ্কের এই অর্থের লেনদেনের আড়ালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নগরবাসীর চলাচলের অধিকার, বাড়ছে
যানজট ও জনদুর্ভোগ। দীর্ঘদিন ধরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও ফুটপাত দখল এবং চাঁদাবাজির
এই চক্র ভাঙা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়
নিয়মিত হকারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময় এ সংখ্যা বেড়ে
প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছায়। হকারপ্রতি প্রতিদিন গড়ে ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা
হলে দৈনিক আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ কোটি টাকার বেশি। সেই হিসাবে বছরে চাঁদা আদায়ের পরিমাণ
কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

এর আগে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (
আইজিডি) এক গবেষণায় ঢাকার ফুটপাত থেকে বছরে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য
উঠে এসেছিল। সংশ্লিষ্ট গবেষকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই অঙ্ক বেড়ে প্রায় ৩ হাজার 
কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীর গুলিস্তান, নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা মোড়, 
গোলাপশাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ও ফুলবাড়িয়া এলাকায় ফুটপাতকেন্দ্রিক
হকারদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। তবে চাঁদাবাজির বিস্তৃতি শুধু এসব বাণিজ্যিক এলাকায় সীমাবদ্ধ
নয়। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকার সামনের ফুটপাতেও দোকান, ভ্যান ও 
অস্থায়ী স্থাপনা বসিয়ে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

চাঁদার পরিমাণও নির্ধারিত হয় দোকানের আকার, অবস্থান এবং পণ্যের ধরন অনুযায়ী। ছোট দোকান
বা ভ্যান থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আদায় করা হলেও বড় টেবিল বা চৌকির ক্ষেত্রে
এই অঙ্ক ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ ব্যবহারের নামে প্রতিটি
বাল্বের জন্য ১০০ টাকা এবং নিরাপত্তার অজুহাতেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়।

ফুটপাতকেন্দ্রিক এই অবৈধ অর্থনীতির পেছনে রয়েছে সংগঠিত একটি চাঁদাবাজ চক্র। হকারদের
অভিযোগ এবং বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু
করে এর বণ্টন পর্যন্ত রয়েছে একাধিক স্তরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইজিডির গবেষণায় চাঁদার অর্থ বণ্টনের যে চিত্র উঠে এসেছে, 
তাতে তিনটি পক্ষের মধ্যে এই অর্থ ভাগ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আদায় করা অর্থের ৩০ শতাংশ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। মাঠপর্যায়ে
চাঁদা সংগ্রহ, দোকানের জায়গা নিয়ন্ত্রণ এবং হকারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের সঙ্গে যুক্ত
লাইনম্যান ও নিয়ন্ত্রণকারীরা পান ৪০ শতাংশ। বাকি ৩০ শতাংশ যায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের
কাছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণকারী এই চক্রের কাঠামো
খুব একটা বদলায় না। বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুরোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে নতুন প্রভাবশালী
ব্যক্তিরা যুক্ত হয়ে চাঁদাবাজির কার্যক্রম চালিয়ে যান।

অন্যদিকে, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার
করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন
থেকেই যাচ্ছে।

রাজধানীর ফুটপাতকে পথচারীদের জন্য নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য করতে শুধু উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট
নয়। একই সঙ্গে হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা
প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

ঢাকার সব হকারকে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের আওতায় আনতে হবে। নিবন্ধিত হকারদের পরিচয়পত্র
এবং নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক অনুমতিপত্র দিতে হবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত হকারদের সংখ্যা, ব্যবসার
ধরন ও অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।

নিবন্ধিত হকারদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে সরকারি ফি বা টোল আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে
পারে। এ অর্থ সরাসরি সিটি করপোরেশন বা সরকারি কোষাগারে জমা হবে। ফলে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের
মাধ্যমে অর্থ আদায়ের সুযোগ কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত লাইনম্যান, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং অসাধু
প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করতে হবে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে
জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সিটি করপোরেশনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর
সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে 
হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রশাসনিক প্রভাব যেন তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা
হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ফুটপাতের মূল ব্যবহার নিশ্চিত করতে পথচারীদের চলাচলের জায়গা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে
হবে। তবে হকারদের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টিও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ জন্য জনসমাগম ও চলাচলের চাপ বিবেচনায় নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম ব্যস্ত সড়ক বা নির্দিষ্ট
স্থানে হকারদের জন্য ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর, সাপ্তাহিক
ছুটির দিন কিংবা নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ব্যবসার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে হকারদের জন্য আধুনিক ও পরিকল্পিত হকার্স মার্কেট, নির্ধারিত বাজার কিংবা
বিশেষ হকার্স কর্নার নির্মাণ করতে হবে। এতে একদিকে যেমন ফুটপাত দখলমুক্ত করা সম্ভব 
হবে, অন্যদিকে হকারদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থাও তৈরি হবে।

ফুটপাত দখল এবং চাঁদাবাজি প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার, পুলিশ, সিটি করপোরেশন, নাগরিক প্রতিনিধি
ও সুশীল সমাজের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন।

এই কমিটি নিয়মিতভাবে ফুটপাতের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং চাঁদাবাজি কিংবা অবৈধ 
দখলের অভিযোগ তদন্ত করবে। উচ্ছেদ অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো যাতে আবার দখল হয়ে
না যায়, সে জন্য স্থায়ী নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোথায়, কখন এবং কার বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তার তথ্যও জনসমক্ষে প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমের
জবাবদিহি বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে।

ঢাকার ফুটপাত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি নগরবাসীর নির্বিঘ্নে
হাঁটাচলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। অথচ দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ফুটপাতকে
অবৈধ আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ফুটপাত ছেড়ে মূল
সড়কে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, যানজট ও নগরজীবনের ভোগান্তি।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু হকার উচ্ছেদ নয়, বরং ফুটপাতকেন্দ্রিক অবৈধ অর্থনীতির
মূল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে দিতে হবে। হকারদের জন্য বৈধ ও পরিকল্পিত ব্যবসার সুযোগ 
তৈরি, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নিয়মিত তদারকি—এই
চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অবৈধ দখলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা চক্রের বিরুদ্ধে
কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া ফুটপাত দখলমুক্ত করা সম্ভব নয়। পথচারীর অধিকার রক্ষা এবং হকারদের
জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেই ঢাকাকে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, চলাচলবান্ধব
ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
