জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস
বাংলাদেশের একটি জাতীয় দিবস ও সরকারি ছুটির দিন যা ২০২৫ সাল থেকে প্রতিবছরের ৫ আগস্টে পালিত হচ্ছে।
৫ আগস্ট ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ঘটে এবং তার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে যা পরবর্তীতে ৩৬ জুলাই নামে পরিচিতি পায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রস্তাবিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের অ্যালোকেশন অব বিজনেসে দিনটি পালনের ব্যাপারে উল্লেখ ছিল যা গৃহীত হয়। এরপর ২৫ জুনে দিবসটিকে ক-শ্রেণিভুক্ত তথা জাতীয় দিবস করা হয় এবং ২ জুলাইয়ে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
পটভূমি
২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে অরাজনৈতিক ছাত্র প্লাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সারাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করে। আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকর্মীদের উপর সহিংসতার ফলে তৎকালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তার অংশ হিসেবে দুই দিনব্যাপী রাজধানী ঢাকায় পরিচালিত লং মার্চের অংশ হিসেবে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ রাজধানীতে আসতে থাকে। ফলে বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে বোন শেখ রেহানা সহ দেশ ছেড়ে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং তার দলের ১৫ বছরের শাসনকালের অবসান ঘটে।[২] চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তখন ৫ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল।[৩] ঘটনার পর দিনটিকে আন্দোলনকারীরা ৩৬ জুলাই হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করে।[৪] ৯ আগস্ট ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে ৫ আগস্টকে “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র দিবস” ঘোষণা করে।[৫] ২০ আগস্ট ২০২৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।[৬] ১৬ অক্টোবর ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম জানিয়েছিলেন যে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সম্পর্কিত একটি তারিখ জাতীয় দিবসের তালিকায় যুক্ত হবে এবং এ নিয়ে সরকারে আলোচনা চলমান রয়েছে।[৭] একই দিনে অনলাইন সক্রিয়কর্মী পিনাকী ভট্টাচার্য দিনটিকে “ফ্যাসিবাদ পতন দিবস” বা “মহান পলায়ন দিবস” হিসেবে সরকারি ছুটির দিন করার প্রস্তাব দেন।[৮] এর পরের দিন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তাদের একটি সূত্র জানিয়েছিল যে দিনটি একইসাথে সরকারিভাবে সাধারণ ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং মন্ত্রিপরিষদের সভায় আলোচনার পর সম্ভাব্য সরকারি ছুটির দিনটির একটি নাম ঠিক করে দেওয়া হবে।[৯] মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর গঠনের জন্য প্রস্তুতকৃত অ্যালোকেশন অব বিজনেস প্রস্তাবে দিনটি পালনের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছিল যা ৬ জানুয়ারি ২০২৫ সালে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে পাঠানোর পর তাদের বৈঠকে অনুমোদিত হয়।[১০] ২৯ এপ্রিল ২০২৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় দিবসটির নাম বাছাই করে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত করার একটি প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।[১১] ১৬ জুন ২০২৫ সালে ইনকিলাব মঞ্চ দেশের স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের সাথে তুলনা করে দিনটিকে “জাতীয় মুক্তি দিবস” হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানায়।[১২] ১৯ জুন ২০২৫ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী উক্ত বছর থেকে নিয়মিত দিনটিতে সরকারি ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেন।[১৩] ২৪ জুন ২০২৫ সালে সরকারের পক্ষ থেকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ২৬ দিনব্যাপী ‘জুলাই স্মৃতি উদ্যাপন অনুষ্ঠানমালা’ উদযাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়, যার মধ্যে ৩৬ জুলাই অন্তর্ভুক্ত ছিল।[১৪] ২৫ জুন ২০২৫ সালে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৬ জুলাইকে “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস” ঘোষণা করে এবং এটিকে ক শ্রেণিভুক্ত দিবসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।[১৫] ২ জুলাই ২০২৫ সালে দিনটিকে সরকার প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সরকারি বার্ষিক ছুটির দিন ঘোষণা করে।[১৬] পরের দিন বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এর অন্তর্ভুক্ত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে চিঠি প্রেরণ করে দিনটি পালনের নির্দেশ প্রদান করে।[১৭] ১৭ জুলাই ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক দিনটিতে দেশের সকল ব্যাংক বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়।[১৮]
উদযাপন
২০২৫ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে সারা দেশে জুলাই গণহত্যায় নিহতদের জন্য কোরআন খতম, দোয়া মাহফিল ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।[১৯] এছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন দিবসটি বিভিন্ন কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপন করে।[২০] দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দিবসের স্মারক ডাকটিকেট উন্মুক্ত করেন।[২১] এছাড়া জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ এই দিনে উদ্বোধন করা হয়।[২২] ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।[২৩] অনুষ্ঠানে সঙ্গীতানুষ্ঠান আয়োজিত হয়।[২৪] বিকেলে মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।[২৫] রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে জুলাই গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে আকাশে ১২ মিনিটের ড্রোন শো দেখানো হয়।[২৬]