আধিপত্য বিস্তার ও আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হঠাৎ অস্থির হয়ে পড়েছে দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। গত কয়েক দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। মূলত ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
একে অপরকে বিভিন্ন নামে ট্যাগিংয়ের কারণে উত্তেজনার সূত্রপাত। শিবিরকে ‘গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে ছাত্রদলের দেয়াল লিখন, আর ছাত্রদলকে ‘খাম্বা’ ও ‘চাঁদাবাজ’ বলে শিবিরের মিছিলের কারণে দু’পক্ষ একাধিকবার হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ধারালো অস্ত্র।
গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ছাত্রদলের গ্রাফিতি নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় দুই সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এর রেশ ধরে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিমূলক ফটোকার্ড তৈরি করা নিয়ে শাহবাগ থানায় আবারও সংঘর্ষ হয় দুপক্ষের। সর্বশেষ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক হলে সিট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
এ নিয়ে অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীরাও নানা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও পাল্টা অভিযোগ আনছেন। জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। ছাত্র সংগঠনগুলোর অভিভাবক রাজনৈতিক দলের নেতারাও পরস্পর বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে রাজপথ ও সংসদে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের দুই মাসের মাথায় শিক্ষাঙ্গনের এমন অস্থিরতা দেশের জন্য অশনি সংকেত। কারণ এতে শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা বিরাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে সবপক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সবাইকে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও সোচ্চার হতে হবে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘শিক্ষাঙ্গনে যেকোনও অস্থিরতা সামগ্রিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’’
কী নিয়ে উত্তেজনা?
কয়েক দিন ধরেই প্রায় প্রতিটি ক্যাম্পাসেই মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে প্রধান দুই ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির। জানা গেছে, মূলত দুটি ঘটনা থেকে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রথমে গত ২০ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে উপাচার্য কার্যালয়ে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে যান ডাকসু নেতারা। এতে নেতৃত্ব দেন ভিপি সাদিক কায়েম। তাদের দাবি, নিয়মবহির্ভূতভাবে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের ২০ শিক্ষার্থীকে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ সময় পাশে থাকা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এর প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, যারা বরাদ্দ পেয়েছেন তা সঠিকভাবেই হয়েছে। বরং ৫ আগস্টের পর মব সৃষ্টি করে আবাসিক হলে নিজেদের গুপ্তকর্মীদের সিট দিয়েছে শিবির। এ সময় ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে মোহাম্মদ ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের সঙ্গে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের তুমুল বাগবিতণ্ডা হয়। ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ, শিবিরের নেতাকর্মীরা বিগত দিনে ছাত্রলীগ করতো। অবশ্য শিবির নেতারা তা অস্বীকার করেন।
দ্বিতীয় ঘটনার সূত্রপাত ঘটে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে। গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) ক্যাম্পাসের দেয়ালে লেখা ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ’ গ্রাফিতি থেকে ‘ছাত্র’ মুছে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। দুই দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে স্থানীয় ওয়ার্ড শিবির সভাপতি আশরাফুল ইসলামের পায়ের একটি গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
থামছে না অস্থিরতা
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে কটূক্তির অভিযোগ ওঠে ডাকসু নির্বাচনে হল সংসদ নির্বাচনে শিবিরের প্যানেল থেকে কার্যনির্বাহী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত সদস্য প্রার্থী মাহমুদের বিরুদ্ধে। তবে তার অভিযোগ, ছাত্রদলের পক্ষ থেকে তাকে হত্যার হুমকির দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সন্ধ্যায় তিনি শাহবাগ থানায় জিডি করতে যান। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তাদের আটকে রাখা হয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাদের উদ্ধার করতে যান ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের ও সাহিত্য সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে মোহাম্মদসহ কয়েকজন। তখন ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়। এতে মারধরের শিকার হন জুবায়ের ও মোসাদ্দেক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাংবাদিক। যদিও ছাত্রদলের সিনিয়র নেতারা তাদের উদ্ধার করেন।
ঘটনার খবর পেয়ে শাহবাগ থানায় ছুটে যান ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। দুপক্ষই সেখানে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। ছাত্রদল সভাপতি শিবিরের আহতদের গাড়িতে তুলে হাসপাতালে পাঠান।
একই দিন পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে দুইপক্ষ।
সর্বশেষ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ছাত্রাবাসে সিট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রমেক) ক্যাম্পাস। লটারি ছাড়াই কক্ষ বরাদ্দের অভিযোগে অধ্যক্ষের কক্ষে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অবস্থানের পর ছাত্রদলের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা ও পাল্টাপাল্টি মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। এতে স্বচ্ছতা ধরে রাখার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এই ঘটনাকে ঘিরে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ারও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সংঘর্ষে জড়ায় দুপক্ষ। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও শোডাউন করেছে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির।
ফেসবুকেও ‘বাগযুদ্ধ’ ছাত্রনেতাদের
শিবির ও ছাত্রদলের মারমুখী অবস্থানের চিত্র শীর্ষ নেতাদের ফেসবুকেও ফুটে উঠেছে। কোনও পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তারা নিজেদের আইডি থেকে শেয়ার দিচ্ছেন। একে অপরকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। আনছেন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ।
শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এজিএস এস এম ফরহাদ ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘‘যতই উসকানি দেওয়া হোক, ক্যাম্পাসে কোনও সন্ত্রাসীদের ঠাঁই হবে না।’’
একই ধরনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
অপরদিকে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্টজনদের নিয়ে উসকানির জন্য শিবিরের ‘বট আইডি’র কথা উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি সবপক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান। অবশ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএস সালাহ উদ্দিন আম্মারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
দুই সংগঠনের দ্বন্দ্ব, অশনি সংকেত দেখছেন নেতারা
প্রধান দুটি ছাত্র সংগঠনের সাম্প্রতিক উত্তেজনায় রাজনৈতিক নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, এটি একটি অশনি সংকেত। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
ক্যাম্পাসে এই দুই সংগঠনের সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অস্থির হওয়া কারও জন্যই কাম্য হওয়া উচিত নয়। অবশ্যই এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।’’
বিএনপির নেতা ও সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একটি ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করতে গুপ্ত কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তারা ছদ্মনামে আবাসিক হলে নিজেদের নেতাকর্মীদের স্থান দিয়েছে। আর ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে বট আইডি দিয়ে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের কারণেই সাম্প্রতিক অস্থিরতা।’’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চায়। এটি এখনই থামাতে না পারলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। আশা করি সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।’’