১১ বছরের প্রতীক্ষার পর যমজ সন্তান: হামে মেয়ের মৃত্যু, ছেলে হাসপাতালে

দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার পর একসঙ্গে দুটি প্রাণের আলো এসেছিল রুমার জীবনে—একটি ছেলে, একটি মেয়ে। হঠাৎ করেই সেই আলোই যেন নিভে গেল নির্মম বাস্তবতার আঁধারে। রাজধানীর শ্যামলীতে শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ঢোকার মুখেই এক মায়ের আর্তনাদ কাঁপিয়ে দিচ্ছিল চারপাশ—রুমার কান্নায় যেন জমে ছিল সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ আকুতি।

কথা বলে জানা গেলো, গত এক সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছিল রুমার যমজ দুই শিশু। তাদের নিয়ে দিশেহারা রুমা প্রথমে আশ্রয় নেন কুষ্টিয়ার একটি হাসপাতালে। সেখানে জানতে পারেন হাম বাসা বেঁধেছে তাদের ছোট্ট সন্তানের শরীরে। চিকিৎসা চলা অবস্থাতেই আজ মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে থেমে যায় কন্যাশিশুটির নিঃশ্বাস। মেয়ে হারানোর শোক করার মতো সময় হয়নি রুমার। মেয়ের নিথর দেহ বাবার কাছে রেখে ছেলেকে নিয়ে রওনা হয়েছেন ঢাকার উদ্দেশে। এসেছেন শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে। সঙ্গে আসা অন্য স্বজনরা অসুস্থ ছেলেকে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন। আর রুমা আহাজারি করে যাচ্ছেন মেয়ের কথা বলতে বলতে।

সকাল থেকে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সরেজমিনে অবস্থান করে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হতে হয় প্রতিবেদককে। বিকেল ৪টার দিকে হামের ওয়ার্ডে ঢোকার মুখে শোনা যায় চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ। কাছে গিয়ে জানা যায় হামে আক্রান্ত হয়ে এক সন্তানের মৃত্যুর পরে অন্য সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন সন্তানের মা রুমা। এই আর্তনাদ ছিল তারই।

মেয়ে হারানোর শোকও ঠিক মতো করতে পারেননি রুমা। ছবি: প্রতিবেদক

এসময় কথা হয় রুমার সঙ্গে হাসপাতালে আসা তার স্বামীর ভাইয়ের স্ত্রী সীমা আক্তারের। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এসেছি কুষ্টিয়া থেকে। রুমার তিন সন্তান, বড় মেয়ের বয়স আনুমানিক ১৫ বছর। তারপর ১১ বছরের অপেক্ষা করে যমজ সন্তান হয় তার। এক ছেলে আর এক মেয়ে। ওদের বয়স ১০ মাস। গত এক সপ্তাহ ধরে অনেক জ্বর-ঠান্ডা ছিল দুজনেরই। ১০৩ ডিগ্রি থেকে আর কমে না। পরে কুষ্টিয়াতেই প্রাইভেট চেম্বারে ডাক্তার দেখানো হয়। কিন্তু কী ওষুধ দেয়, জ্বরই নামে না। ভর্তিও করা হয় কুষ্টিয়ার একটি হাসপাতালে। পরে আজকে সকালে সাড়ে ৪টার দিকে মেয়েটা মারা যায়। ওর নাম ছিল হাবিবা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেয়েটা মারা যাওয়ার পরে আমরা ওই হাসপাতাল থেকে ছেলেটাকে নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা দেই। আর ওর (শিশু) বাবা মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ির দিকে যায়। কী হয় এখন আল্লাহ জানে।’

এই শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে সীমা বলেন, ‘টিকা আগে দেওয়া হয়নি। আর এখন জ্বর থাকায় টিকা দিতে দেয়নি ডাক্তার।’

শিশু হাসপাতালে হাম রোগী (4)

কেবল রুমা না, আতঙ্কে অন্য রোগীরাও

রুমার মত এমন ঘটনা ঘটেছে আরও অনেক মায়ের সঙ্গেই। আর এখন যারা ভর্তি আছেন তাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই জানেন না কী হবে, তবে সবার প্রত্যাশা তাদের সন্তান সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েই ফিরবে বাড়ি।

ওমর ফারুক মিরপুরের রূপনগরের বাসিন্দা। ১ বছর ১০ মাসের মেয়েকে নিয়ে এসেছেন শিশু হাসপাতালে। তিনি বলেন, ‘তিন চারদিন ধরে আমার মেয়ের জ্বর-ঠান্ডা, পাতলা পায়খানা হচ্ছে। আর দুদিন ধরে গায়ে ছোট ছোট লাল লাল দানা উঠেতে শুরু করেছে। গতকাল মিরপুরের শিশু হাসপাতালে নিয়েছিলাম। ডাক্তার দেখে বললো হাসপাতালে ভর্তি হতে; কিন্তু সেখানে সিট নেই। তাই আজকে এখানে এসেছি। এখন দেখি ডাক্তার কী বলে। যদিও কালকে ওখানের ডাক্তার হামের ইঙ্গিত দিয়েছে। তাই আর দেরি করিনি। ওর টিকাও দেওয়া নেই।’

পাবনা থেকে এসেছেন সানোয়ার হোসেন। তার বাচ্চার বয়স ৮ মাস, হামে আক্রান্ত হয়েছিল। সেটা অনেকটা কমলেও এখন জ্বর নামছে না, এমনই জানান সানোয়ার। তিনি বলেন, ‘জ্বর না কমার কারণে পাবনার হাসপাতাল থেকে পাঠিয়ে দিয়েছে ঢাকায়।’

শিশু হাসপাতালে হাম রোগী (5)

হাসপাতালে অন্যান্য রোগ নিয়ে আসা রোগীরাও হামের সংক্রমণে আতঙ্কে আছেন। এমনকি কেউ কেউ এরই মধ্যে আক্রান্তও হয়েছেন। কেরানীগঞ্জ থেকে হাসপাতালে এসেছেন উরবানা শারমিন। তিনি বলেন, ‘আমরা ৩০ এপ্রিল হাসপাতালে আসি। তখন আমার সন্তানের হামের কোনও সমস্যা ছিল না। ওর মূল সমস্যা ছিল প্রস্রাবের ইনফেকশন। যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে জ্বর যাচ্ছিল না। প্রায় ১৩ দিন ধরে জ্বর না কমায় তাকে ভর্তি করানো হয়। তখন তার কোনও ঠান্ডা, কাশি বা হাঁচির সমস্যা ছিল না। তখন আমরা পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। তারপরই ও হামে আক্রান্ত হয়। সম্ভবত ওই হাসপাতাল থেকেই আক্রান্ত হয়েছে। তারপর ওর নিউমোনিয়া হয়ে যায়।’

এসময় হাসপাতালে ‘ফ্রি বেড’ বাড়ানোর দাবি জানান এই অভিভাবক। তিনি বলেন,‘এখানে (শিশু হাসপাতাল) ফ্রি বেড কম। আর সব মানুষের জন্য ফ্রি সেবা দেওয়া সম্ভবও না। কিন্তু যদি কিছুটা বাড়ানো যায়, যদি সরকার এসব বিষয় সঠিকভাবে দেখে, তাহলে হয়তো স্বল্প আয়ের মানুষের উপকার হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ। যেসব রোগী সংক্রামক রোগে আক্রান্ত, তাদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া উচিত। যদি আলাদা ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে হয়তো এত সংক্রমণ ছড়াতো না।’

শিশু হাসপাতালে হাম রোগী (3)

খুলনা থেকে আসা সনিয়া খাতুন বলেন, ‘বাচ্চার হাম আর নিউমোনিয়া নিয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি আছে আজকে ১২ দিন হলো। এর আগে আমাদের পাবনার একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। সেখান থেকে আমাদের ঢাকায় রেফার করে। হাম আল্লাহর রহমতে এখন নেই। কিন্তু নিউমোনিয়া কমছে না। ডাক্তার বলেছে নিউমোনিয়া ভালো না হলে যাওয়া যাবে না। তাই আমরা অপেক্ষা করছি ওর নিউমোনিয়া কমার জন্য।’

কমছে জটিল রোগীর সংখ্যা 

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সেভাবে না কমলেও কমেছে জটিল রোগীর সংখ্যা। একইসঙ্গে অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন বলেও জানান তারা।

হামে আক্রান্ত হয়ে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে কিনা বা বর্তমান পরিস্থিতি কী জানতে চাইলে হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. শামসুদ্দোহা উলফাত বলেন, ‘এটা হামের ওয়ার্ড, এখানে সবসময় রোগী ভর্তি থাকে। কখনোই পুরোপুরি খালি থাকে না। ভেতরের ওয়ার্ডগুলোতেও সবসময় রোগী থাকে। হার্টের ওয়ার্ডেও একই অবস্থা—সবসময়ই রোগী ভর্তি থাকে। একইভাবে আইসিইউসহ অন্যান্য ওয়ার্ডেও রোগী পূর্ণ থাকে।’

শিশু হাসপাতালে হাম রোগী (6)

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তখন যে চাপ অনুভূত হচ্ছিল, এখন সেই চাপ কিছুটা কমেছে। আগে আইসিইউতে অনেক জটিল ও খারাপ অবস্থার রোগী থাকত, এখন সেই ধরনের জটিল কেস কিছুটা কমে এসেছে। তবে রোগীর সংখ্যা খুব বেশি কমেনি; ওয়ার্ডগুলো এখনো ভর্তি থাকে। এখন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠছেন, তবে এখনও বেশ কিছু গুরুতর ও খারাপ অবস্থার রোগীও রয়েছে।

নাম পরিচয় জানাতে অনিচ্ছুক এই হাসপাতালের হামের ওয়ার্ডে দায়িত্বরত একজন বিকেল ৪টার দিকে জানান, সোমবার দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত ৯২ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এতদিন কিন্তু এত রোগী ছিল না। আমি দেখেছি ৮০ থেকে ৮৫ জন রোগী থাকতো। এখন দেখছি এরকম বেড়ে গিয়েছে। তবে আগে যেমন সিরিয়াস রোগী অনেক থাকতো। সেটা এখন আর নেই। অনেক কমে গিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *