নিউহ্যামে ফরহাদের জয় ও আরিকের হার, নেপথ্যে কি ‘সিলেটি ইস্যু’

পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যামে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এক অভাবনীয় রাজনৈতিক মোড় লক্ষ্য করা গেছে। এবারের নির্বাচনে গ্রিন পার্টির ব্যাপক উত্থান ঘটলেও মেয়র পদে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আরিক চৌধুরীর হার এবং লেবার পার্টির ফরহাদ হোসেনের বড় জয় নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশ্লেষকদের মতে, আরিকের উচ্চশিক্ষা ও পেশাদার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তার হারের পেছনে এবং ফরহাদের জয়ের নেপথ্যে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে ‘আঞ্চলিক পরিচয়’।

নির্বাচনে তৃতীয় হয়েছেন গ্রিন পার্টির আরিক চৌধুরী। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিউহ্যামের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ভোটারদের মধ্যে আঞ্চলিক শেকড়ের টান একটি বড় প্রভাব ফেলেছে। বিজয়ী মেয়র ফরহাদ হোসেন এবং আরিক চৌধুরী উভয়ই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হলেও তাদের আদি নিবাস ভিন্ন অঞ্চলে।

নিউহ্যামের বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটি বিশাল অংশ সিলেট অঞ্চলের। সিলেটি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেন এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আবেগ ও সমর্থনকে সফলভাবে নিজের পক্ষে সংহত করতে পেরেছেন। অন্যদিকে, আরিক চৌধুরীর আদি নিবাস চট্টগ্রামে হওয়ায় তিনি কমিউনিটির একটি বড় অংশের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। এমনকি নিউহ্যামে বসবাসরত চট্টগ্রাম বংশোদ্ভূত অনেক ভোটারও জানতেন না যে আরিক তাদেরই অঞ্চলের সন্তান। তিনি যে একজন বাংলাদেশি, এই বার্তাটি ভোটারদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাতে পারলে নির্বাচনের ফলাফল ভিন্ন হতে পারত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আরিক চৌধুরীর ক্যারিয়ার প্রোফাইল অত্যন্ত শক্তিশালী। ব্রিটিশ ফরেন অফিস, ডিসিএমএস, কেপিএমজি এবং রয়্যাল সোসাইটির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে একজন যোগ্য আধুনিক নেতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। তা সত্ত্বেও স্থানীয় ভোটের লড়াইয়ে পেশাদার দক্ষতার চেয়ে আঞ্চলিক সংহতি ও ব্যক্তিগত পরিচিতিই বেশি কার্যকর হয়েছে।

বিপরীতে, ফরহাদ হোসেনের পক্ষে পুরো ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটি দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এমনকি যারা প্রথাগতভাবে লেবার পার্টির সমর্থক নন, তারাও একজন ‘বাংলাদেশি’ প্রতিনিধিকে জয়ী করতে একযোগে ফরহাদকে ভোট দিয়েছেন।

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজয়ী গ্রিন কাউন্সিলরদের বাংলায় ভাষণ দেওয়া নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি হলেও স্থানীয়রা একে ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই দেখছেন।

পরাজিত হলেও আরিক চৌধুরী নিউহ্যামের আবাসন সংকট এবং নাগরিক সেবার বেহাল দশা নিয়ে যে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন, তা তাকে জনমানসে একজন সচেতন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের রাজনীতিতে আরিক যদি এই আঞ্চলিক ও ভাষাগত দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর কমিউনিটির নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, তবে পেশাদার মেধা ও সামাজিক শক্তির সমন্বয়ে তিনি লন্ডনের রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *