ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা বিক্ষোভ করছেন কেন

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অন্যতম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে আবারও তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটির হাজার হাজার গ্রাহক, আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। তাদের আন্দোলনের কারণে নতুন চেয়ারম্যানের যোগদান উপলক্ষে ডাকা পরিচালনা পর্ষদের সভাও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের এত বড় আন্দোলনের কারণ কী? কেন ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকরা রাস্তায় নেমে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন?

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি শুধু একজন চেয়ারম্যানের নিয়োগকে ঘিরে নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, অতীতের বিতর্ক, আমানতকারীদের আস্থার সংকট এবং ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে আপত্তি

গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিন রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

আন্দোলনকারীদের প্রধান অভিযোগ হলো, এই নিয়োগে ব্যাংকের প্রকৃত শেয়ারহোল্ডার, গ্রাহক কিংবা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। তাদের দাবি, চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া ছিল অস্বচ্ছ এবং তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

গ্রাহকদের একটি বড় অংশের আশঙ্কা, নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ব্যাংকটি আবারও এমন কোনও গোষ্ঠীর প্রভাববলয়ে চলে যেতে পারে, যারা অতীতে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সুশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

এস আলম গ্রুপের প্রভাব ফিরে আসার আশঙ্কা

আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এস আলম গ্রুপকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক।

২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তনের পর থেকে ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সে সময় ব্যাংকটির ওপর এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী কয়েক বছরে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। তখন অনেক গ্রাহক ও আমানতকারী মনে করেছিলেন, ব্যাংকটি ধীরে ধীরে পূর্ববর্তী বিতর্কিত প্রভাবমুক্ত হচ্ছে।

কিন্তু নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর আন্দোলনকারীদের একাংশের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী আবারও ব্যাংকটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, তবুও এই আশঙ্কাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

ওমর ফারুক খানকে ঘিরে আস্থার প্রশ্ন

আন্দোলনকারীদের দ্বিতীয় বড় দাবি হলো সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল করা।

তাদের ভাষ্য, গত দুই বছরে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, তারল্য পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখতে ওমর ফারুক খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে তাকে সরিয়ে দেওয়া এবং নতুন নেতৃত্ব আনার সিদ্ধান্তকে তারা ব্যাংকের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন।

অনেক গ্রাহকের মতে, বর্তমান আন্দোলন মূলত কোনো ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নয়; বরং ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার দাবির বহিঃপ্রকাশ।

আমানত ও অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো তাদের আমানতের নিরাপত্তা। গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট, বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ এবং অর্থনৈতিক অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হয়েছে। ফলে অনেক আমানতকারীর মধ্যে এখনও উদ্বেগ রয়ে গেছে।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, ব্যাংকের পরিচালনায় এমন কোনো পরিবর্তন তারা চান না, যা ভবিষ্যতে আবারও ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাদের মতে, চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত সরাসরি ব্যাংকের স্থিতিশীলতা এবং আমানতকারীদের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে অভিযোগ করেছে যে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে একটি রাজনৈতিক পক্ষ সক্রিয়ভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান স্পষ্টভাবে বলেছেন, কোনো ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে পরিচালিত হতে পারে না এবং রাস্তার আন্দোলনের মাধ্যমে ব্যাংক-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না।

অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, তারাই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং ব্যাংকের স্বাধীনতা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্দোলন করছেন।

ফলে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমানে দুই ধরনের বর্ণনা সামনে এসেছে— একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি। এর ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বোর্ড সভা ভেস্তে যাওয়ার তাৎপর্য

সোমবার (১ জুন) নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা। কিন্তু সকাল থেকেই হাজারো গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেওয়ায় সশরীরে সভা আয়োজন সম্ভব হয়নি।

পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে ভার্চুয়ালি সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্দোলনকারীদের তীব্র বিরোধিতার কারণে সেটিও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত করা যায়নি।

একটি ব্যাংকের বোর্ড সভা গ্রাহকদের আন্দোলনের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাতে অত্যন্ত বিরল। এটি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে গ্রাহকদের আবেগ, উদ্বেগ ও সম্পৃক্ততা অন্য অনেক ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি।

মূলত কী কারণে বিক্ষোভ

সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের চলমান বিক্ষোভের পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ রয়েছে—

১. নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগের বিরোধিতা।

২. সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের দাবি।

৩. ব্যাংকের ওপর এস আলম গ্রুপ বা অন্য কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসার আশঙ্কা।

৪. আমানত ও ব্যাংকের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।

৫. ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ।

সামনে কী হতে পারে?

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকের সংকট কেবল একটি চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন ব্যাংকটির সুশাসন, মালিকানা কাঠামো, গ্রাহকদের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কে রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে, তারা আইন ও বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে এবং আন্দোলনের চাপে কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরাও তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ফলে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও পরিচালনা নিয়ে সৃষ্ট এই অচলাবস্থা কীভাবে সমাধান হবে, সেটিই এখন ব্যাংকিং খাতের অন্যতম আলোচিত প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *