সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং ভারতের উজানে শুরু হওয়া অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুর বিভাগের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে বান্দরবান ও কক্সবাজারের দুটি স্টেশনে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশের অন্তত পাঁচটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে কেন্দ্রটির সহকারী প্রকৌশলী ইমন কল্যাণ দাস স্বাক্ষরিত বৃষ্টিপাত, নদ-নদীর পরিস্থিতি ও বন্যা পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমানে বান্দরবানে সাঙ্গু এবং মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বান্দরবান স্টেশনে সাঙ্গু নদীর পানির স্তর ১৪ দশমিক ৮০ মিটার, যা বিপৎসীমার ৯৬ সেন্টিমিটার ওপরে। একইভাবে লামা স্টেশনে মাতামুহুরী নদীর পানির স্তর ১১ দশমিক ৮০ মিটার, যা বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার বেশি।
বর্তমানে দেশের ১২৭টি পানি সমতল পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৬৯টিতে পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ৫৩টিতে কমেছে। পাঁচটি স্টেশনে পানির স্তর অপরিবর্তিত রয়েছে। যদিও কোনো স্টেশন এখনো বন্যা সতর্কসীমা অতিক্রম করেনি, তবে নদীসংলগ্ন আক্রান্ত জেলা হিসেবে বর্তমানে বান্দরবান ও কক্সবাজারকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশেও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ে দেশে সর্বোচ্চ ২৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে। এছাড়া লামায় ২১৮ মিলিমিটার, বান্দরবানে ১৯৫, ভৈরব বাজারে ১৯৩, ইটাখোলায় ১৮৮, দেওয়ানগঞ্জে ১৮৪, রাঙামাটিতে ১৬৪, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৫৬, চিলমারীতে ১৫০, পাঁচপুকুরিয়ায় ১৪৮ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের উজানে মাওসিনরামে সর্বোচ্চ ১৮৩ মিলিমিটার, চেরাপুঞ্জিতে ১২৬, আর কে এম সোহরায় ১১৬, কোচবিহারে ১০৪ এবং আগরতলায় ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। পরবর্তী দুই দিনও মাঝারি-ভারী থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এ অবস্থায় চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরি, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি আগামী তিন দিন দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন নদী কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
একই সময়ে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এতে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কয়েকটি স্থানে নদীগুলো বিপৎসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে রংপুর বিভাগের তিস্তা নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নদীটি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ধরলা ও দুধকুমার নদী লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় সতর্কসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুরমা নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী সময়ে এটি সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সতর্কসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করতে পারে। তবে কুশিয়ারা নদীর পানির স্তর বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে।