ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ কত?

যুদ্ধের জেরে ইতোমধ্যে ইরানে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরানের ১৫ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত চালানোর কথা জানিয়েছে পেন্টাগন। এর মধ্যে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মিনাব শহরে একটি মেয়েদের স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ১৭৫ জন শিশু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের জেরে অনেকটা বন্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালি। এ প্রণালি দিয়েই উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি বিশ্বের কাছে পৌঁছায়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা চালানো শুরু করে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সংসদ সদস্যরা পেন্টাগনের কাছে হামলার খরচের হিসাব চায়। বন্ধ দরজায় সংসদ সদস্যদের এ হিসাব দেয় পেন্টাগন। তখন তারা জানিয়েছিলো, প্রথম ছয়দিন তাদের খরচ হয়েছে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা এক হাজার ১৩০ কোটি ডলার।

তবে, অর্থের এ অঙ্ক যুদ্ধ নামক গল্পের একটি অংশ মাত্র। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থাৎ, সংসদ সদস্যদের খরচ সম্পর্কে ব্রিফিং করা একজন দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “আনুমানিক যে খরচের হিসাব দেওয়া হয়েছে সেটি গোলাবারুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। সংঘাতের প্রারম্ভিক দিনের সম্পূর্ণ ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এমনকি ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা বাহিনী, চিকিৎসা ব্যয় এবং যুদ্ধে হারানো সামরিক বিমানগুলোর প্রতিস্থাপনের খরচও অন্তর্ভুক্ত নেই।”

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ থিংকট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মতে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ১২ দশমিক সাত বিলিয়ন বা এক হাজার ২৭০ কোটি ডলার। এ খরচ আজ বুধবার (১৯ মার্চ) পর্যন্ত ১৮ বিলিয়ন বা এক হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

খরচ সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি হোয়াইট হাউস। পেন্টাগন ও সেন্টকমের কাছেও মন্তব্য চাওয়া হলে তারা অন্য সংস্থার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।

যুদ্ধের শুরুর প্রথম কয়েক ঘণ্টার হামলায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কিছু অস্ত্র ব্যবহার করে। এর মধ্যে দীর্ঘ-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক মিসাইলের ইন্টারসেপ্ট এবং রাডার সিস্টেম ছিলো। তবে, বর্তমানে এসব অস্ত্রের মজুত কমে গেছে। এরপর পেন্টাগন তুলনামূলকভাবে সস্তা ও স্বল্প-পাল্লার অস্ত্রে স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু, ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের যে ক্ষতি হয়েছে তা অভাবনীয়।

সিএসআইএস’র তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য গার্ডিয়ান খরচে হিসাব নিয়ে আরেকটি বিশ্লেষণ করেছে। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ কোথায় খরচ হচ্ছে সেটিই বিশ্লেষণ করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি, যা এখন পর্যন্ত কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র রাত ১টা ১৫ মিনিটে অপারেশন ‘ইপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই দিনই মিনাব শহরের স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে খরচ হয় তিন দশমিক পাঁচ মিলিয়ন বা ৩৫ লাখ ডলার।

সিএসআইএস’র তথ্য মতে, ইরান যুদ্ধের প্রথম ছয়দিনে ৩০০টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে পেন্টাগন। এতে তাদের মোট খরচ হয়েছে ১২০ কোটি ডলার।

টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রই একমাত্র গোলাবারুদ নয় যা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী আড়াই হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ছয়দিনে সর্বমোট ৫৫০ কোটি ডলারের গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে পেন্টাগন।

হামলার প্রতিক্রিয়ায় গত ৩ মার্চ আড়াই হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালায় ইরান। এসব হামলা ঠেকাতে খরচ হয় ৫৭০ কোটি ডলার, যার থাডের মতো ইন্টারসেপ্ট।

যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে ১৪০ কোটি এবং পরিচালন ব্যয় ২৭ মিলিয়ন ডলার যোগ করলে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনের মোট ব্যয় প্রায় এক হাজার ২৭০ কোটি ডলার।

যুদ্ধের প্রথম ছয়দিনে যুক্তরাষ্ট্রের যত অর্থ খরচ হয়েছে তা দিয়ে দেশটির সব স্কুল শিক্ষকের ৯ শতাংশের এক বছরের বেতন দেওয়া যেত। এমনকি, এ অর্থ দিয়ে দেশটির ফায়ার সার্ভিসের ৪৭ শতাংশের এক বছরের বেতন দেওয়া যেত। এছাড়া এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ছয় লাখ ৯৩ হাজার সদস্যের চিকিৎসা করানো যেত।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *