কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি আসকের

বাগেরহাটের মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখকে কোস্টগার্ড পরিচয়ে তুলে নিয়ে গুম করার অভিযোগের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

বুধবার (২৯ জুলাই) এক বিবৃতিতে আসক জানায়, অভিযোগ ওঠার পর তারা গত ১৬ ও ১৭ মে দুই দিন সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান চালায়। এ সময় মিরাজের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, সাংবাদিক, পুলিশ এবং কোস্টগার্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন সংগঠনটির প্রতিনিধিরা।

তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসক জানায়, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাদাপোশাকে থাকা কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি জয়মনির ঘোল এলাকার আল আমিনের চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজ শেখকে জোর করে ধরে নিয়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাকে কোস্টগার্ডের একটি স্পিডবোটে তোলা হয়। সেখানে পোশাক পরিহিত আরও সাত-আটজন কোস্টগার্ড সদস্য ছিলেন। মিরাজের স্ত্রীও দাবি করেছেন, তিনি হারবারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের পন্টুনে নিজের চোখে স্বামীকে কোস্টগার্ড সদস্যদের হেফাজতে দেখেছেন এবং পরে তাকে স্পিডবোটে করে নিয়ে যেতে দেখেছেন।

মিরাজের স্ত্রীর দাবি, ঘটনার রাতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. নজমুলের মাধ্যমে কোস্টগার্ড স্টেশনের ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিরাজকে নেওয়া হয়েছে এবং পরে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে পরদিন সকালে পরিবারের সদস্যরা দিগরাজ কোস্টগার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাকে আটক করার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। পরে দায়িত্বরত এক সদস্য জানান, মিরাজকে নিয়ে অভিযানে যাওয়া হয়েছে এবং বিকেলে এলে দেখা করা যাবে।

আসক আরও জানায়, মিরাজকে তুলে নেওয়ার সময় তার মোটরসাইকেলটি স্থানীয় চায়ের দোকানদার আল আমিনের জিম্মায় রেখে যাওয়া হয়। ঘটনার ৮ থেকে ১০ দিন পর গভীর রাতে কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ে মুখোশধারী দুই ব্যক্তি এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান।

তথ্যানুসন্ধানের অংশ হিসেবে আসকের প্রতিনিধিদল দিগরাজ কোস্টগার্ড বেজে গিয়ে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তিনি মিরাজকে আটক বা তুলে নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। একইসঙ্গে মিরাজের পরিবারের সদস্যরা দিগরাজ কোস্টগার্ড বেজে গিয়েছিলেন—এ দাবিও তিনি নাকচ করেন।

লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন আসককে বলেন, জয়মনির ঘোল এলাকা আগে দুষ্কৃতকারীদের ঘাঁটি ছিল। সেখানে কোস্টগার্ডের অভিযানে অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ অভিযোগ তুলেছে।

মিরাজের পরিবারের অভিযোগ, ১০ এপ্রিলের ঘটনার পর একাধিকবার থানায় গেলেও পুলিশ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নিতে অনীহা দেখায়। পরে ২৩ এপ্রিল কোস্টগার্ডের নাম উল্লেখ না করে একটি জিডি নথিভুক্ত করা হয়।

পরিবারের দাবি, পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী জিডিতে উল্লেখ করা হয় যে, মিরাজ নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছেন। কোস্টগার্ড তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগটি সেখানে অন্তর্ভুক্ত করতে দেওয়া হয়নি।

আসকের মতে, প্রাপ্ত তথ্য, ভুক্তভোগীর পরিবার এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ধারাবাহিক বক্তব্যের সঙ্গে কোস্টগার্ডের আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতির মধ্যে স্পষ্ট অসংগতি রয়েছে, যা গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

সংগঠনটির তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়ার পর তার অবস্থান অস্বীকার করা, পরিবারকে তার অবস্থান সম্পর্কে অবহিত না করা কিংবা আইনানুগ সময়ের মধ্যে আদালতে উপস্থাপন না করা সংবিধানে নিশ্চিত জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার অধিকারের পরিপন্থী। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জোরপূর্বক গুম-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

আসক বলেছে, রাষ্ট্রের কোনও বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; বরং আইনের শাসন, জবাবদিহি ও জনআস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।

সংগঠনটি অবিলম্বে মিরাজ শেখের অবস্থান নির্ণয়, তার পরিবারের কাছে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ, অভিযোগের বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *