মধ্যপ্রাচ্যে সপ্তাহান্তে অতিরিক্ত কয়েক হাজার মার্কিন সেনাসদস্য পৌঁছেছেন। এটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ইরানে স্থল অভিযানের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। স্থল অভিযানের মাধ্যমে জোর করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার সম্ভাবনা বাড়লেও কিছু আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া মোট তেলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি করা হয়। এই প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এটি তেহরানকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, তা ট্রাম্প বোঝেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
ইরানে সেনা পাঠানোর চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল একটি অভিযানের কথা ভাবছেন ট্রাম্প। তা হলো ইরানের মূল ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা চালিয়ে দেশটির উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দখল করা।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে তিনি কূটনীতিকে একটি সুযোগ দিতে প্রস্তুত। এরপরও ইরানে বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোববার ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ‘ইরানের তেল দখল’ করতে চান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ট্রাম্পের সামনে দুটি সামরিক পথ খোলা আছে—ইরানের ভূখণ্ড দখল করা অথবা এই জলপথে বিশাল নৌবহর মোতায়েন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন সীমিত আকারে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করলেও এতে যে পরিমাণ প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে, তা একজন প্রেসিডেন্টের মসনদ টলিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে ইরান বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছে, তাদের ভূখণ্ডে বিদেশি সেনারা পা রাখলে, তা হবে রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করা।
যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তন প্রতিষ্ঠান ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ ফেলো এমা সালিসবারি মনে করেন, পারস্য উপসাগরের কোনো একটি ইরানি দ্বীপ দখলের মাধ্যমে যুদ্ধ তীব্রতর করা থেকে ট্রাম্প নিজেকে সামলাতে পারবেন না।
এমা সালিসবারি বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) এখন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে আগ্রাসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবারও সেটার ব্যতিক্রম হবে, তা আমি মনে করি না। সেনা প্রস্তুত থাকলে তিনি তাঁদের ব্যবহার করতে পিছপা হবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ধারণা, এই সিদ্ধান্ত ভয়াবহভাবে ভুল প্রমাণিত হবে এবং এতে প্রচুর প্রাণহানি ঘটবে।’
মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরান একটি হুঁশিয়ারি পাঠিয়েছে। তারা জানিয়েছে, তাদের মাটিতে কোনো মার্কিন সেনা পা রাখলে তাদের হত্যা করতে ইরান নিজের ভূখণ্ডেই ‘কার্পেট বম্বিং’ বা ব্যাপক বোমা হামলা চালাবে। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের মতে, তেহরান সতর্ক করে বলেছে যে হামলাকারী বাহিনীকে আঘাত করতে তারা নিজেদের অবকাঠামো উড়িয়ে দিতেও প্রস্তুত।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ গত রোববার অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে গোপনে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে। গালিবাফ বলেন, ‘আমাদের সেনারা মার্কিন সেনাদের আগমনের অপেক্ষায় রয়েছেন, যাতে তাদের আগুনে পুড়িয়ে মারা যায় এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের আজীবনের মতো শিক্ষা দেওয়া যায়।’ শান্তি আলোচনা শুরু হলে গালিবাফ ইরানের অন্যতম প্রতিনিধি হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে পাঁচ হাজার মেরিন সেনার একটি দলের অর্ধেক সদস্য গত শনিবার মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন। এসব সেনা উভচর সামরিক যান নিয়ে সমুদ্র থেকে ভূখণ্ডে উঠতে পারদর্শী। এ ছাড়া অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ হাজার প্যারাট্রুপার বা ছত্রীসেনাও অল্প কিছুদিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তাঁরা উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টার থেকে প্যারাস্যুটের সাহায্যে যুদ্ধক্ষেত্রে বা শত্রু সীমানায় অবতরণে দক্ষ।
ইরানের জ্বালানি তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খারগ দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য মূল লক্ষ্যবস্তু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এক বা একাধিক ছোট দ্বীপ দখল করা সহজ হলেও মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান মার্কিন সেনাসংখ্যা দিয়ে তা ধরে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। মার্কিন সেনারা সেখানে পৌঁছানোর পর আসল বিপদ শুরু হবে। কারণ, ইরান তখন রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করবে।
বড় ধরনের কোনো স্থল অভিযানের জন্য যে পরিমাণ সেনা দরকার, সেই তুলনায় অনেক কম সেনা নিয়ে ইরানে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছিল। অথচ ইরানের আয়তন ইরাকের তিন গুণের বেশি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন ওই অঞ্চলে আরও ১০ হাজার সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে।
ইরানে সেনা পাঠানোর চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল একটি অভিযানের কথা ভাবছেন ট্রাম্প। তা হলো ইরানের মূল ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা চালিয়ে দেশটির উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দখল করা। এ ধরনের অভিযানের জন্য বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজন হবে। ধারণা করা হয়, সমৃদ্ধ এসব ইউরেনিয়াম এক বা একাধিক স্থানে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছে। এসব স্থানে গত বছর বোমা হামলা চালানো হয়েছিল।
লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা খারগ দ্বীপ দখল করতেও পারি, না–ও করতে পারি। আমাদের সামনে অনেক বিকল্প আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর অর্থ এ–ও হতে পারে যে আমাদের সেখানে (খারগ দ্বীপে) কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করতে হবে।’