ফিফা আসিয়ান কাপে লড়াইটা ছিল সমানে সমান। আক্রমণে উঠেছে বাংলাদেশ, প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপও তৈরি করেছে। কিন্তু গোলমুখে গিয়ে বারবার থমকে গেছে রাকিব-মোরসালিনদের আক্রমণ। সুযোগ পেয়েও জালের দেখা না পাওয়ার সেই আক্ষেপই শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে হারের কারণ। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে হারের পর বাংলাদেশের গোল করতে না পারার আফসোস ঝরেছে কোচ থমাস ডুলির কণ্ঠে।
ম্যাচজুড়ে বাংলাদেশের খেলায় আগের ম্যাচের তুলনায় ছিল স্পষ্ট উন্নতির ছাপ। প্রতিপক্ষের সীমানায় একাধিকবার বল নিয়ে গেলেও কার্যকর ফিনিশিংয়ের অভাবে গোল আদায় করতে পারেনি লাল-সবুজ দল। সিঙ্গাপুরের গোলরক্ষক কিংবা রক্ষণকেও সেভাবে পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি তারা।
তবে দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট ডুলি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেছেন, ‘গত ম্যাচের চেয়ে ভিন্ন একটি দল দেখেছি। তাই খেলোয়াড়রা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে আমি খুবই আনন্দিত। আপনারা দলের খেলার ধরন দেখতে পেয়েছেন। আমরা ফুটবল খেলার চেষ্টা করেছি এবং খেলোয়াড়রা মাঠে কী করার চেষ্টা করেছে, সেটাও আপনারা দেখেছেন। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে আমরা ফুটবল খেলতে পেরেছি।’
শেষ ২০ মিনিটে পাওয়া সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারতো বলেও মনে করেন বাংলাদেশ কোচ। ডুলির ভাষায়, ‘শেষ ২০ মিনিটে যদি আমাদের গোল করার সুযোগগুলো কাজে লাগতো, তবে হয়তো ফলাফল আমাদের পক্ষে আরও ইতিবাচক হতে পারতো। শমিতের চমৎকার একটি সুযোগ ছিল, সে হেড মিস করেছে। তবে খেলোয়াড়দের প্রচেষ্টা খুব ভালো ছিল। তাই যেমনটা বলেছিলাম, গত ম্যাচের পর খেলোয়াড়দের এমন প্রতিক্রিয়ায় আমি খুশি।’
মাঠে খেলোয়াড়দের লড়াইয়ের মানসিকতাতেও সন্তুষ্ট ডুলি। তার মতে, আগের ম্যাচের মতো এবার কয়েকজন নয়, পুরো দলই লড়াই করেছে। ডুলি বলেছেন, ‘আমরা ১১ জন খেলোয়াড় নিয়েই লড়েছি, আগের ম্যাচের মতো নয়। আমার মনে হয় সবাই বুঝতে পেরেছে, লড়াই করলে এবং প্রতিপক্ষকে বেশি জায়গা না দিলে আমরা তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি। লড়াইটা সহজ নয়, কিন্তু আজ আমরা সমান তালে লড়াই করেছি।’
এশিয়ান কাপের লড়াই থেকে ছিটকে যাওয়ার পর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি হিসেবে আসিয়ান কাপে খেলা এই দুই ম্যাচকে কীভাবে দেখছেন- এমন প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী জার্মান-আমেরিকান কোচ। ডুলি বলেন, ‘প্রস্তুতি ভালোই হয়েছে। আমাদের বুঝতে হবে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। এই টুর্নামেন্টে খেলতে পেরে আমরা খুশি। কারণ এখানে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দল রয়েছে, যারা সবাই র্যাঙ্কিংয়ে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। র্যাঙ্কিং এমনি এমনি নির্ধারিত হয় না; তাই পার্থক্যের একটি বড় কারণ রয়েছে। আমরা এখানে সবাইকে হারিয়ে দিতে আসিনি, বরং নিজেদের ভুলগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে শিখতে এসেছি।’
সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঘাটতি যে গোল করা, সেটিও আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছেন ডুলি। দলে একজন আদর্শ ‘নম্বর নাইন’-এর অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন তিনি, ‘মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি খেলোয়াড়দের জন্য একটি বড় শিক্ষা ছিল। আর আজকের ম্যাচ প্রমাণ করেছে যে আমরা খেলতে পারি এবং সিঙ্গাপুরকে হারানোর মতো সামর্থ্যও রাখি। কিন্তু আমাদের বড় সমস্যা হলো গোল করা। দলে এমন কোনও নিখুঁত স্ট্রাইকার নেই যে বল জালে জড়াতে পারে। সামগ্রিকভাবে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে আমি সন্তুষ্ট।’
সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে পারফরম্যান্স মালয়েশিয়া ম্যাচের তুলনায় ভালো হলেও ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচে আরও উন্নতি চান ডুলি। প্রথম ম্যাচে কয়েকজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সে নিজের হতাশার কথাও জানিয়েছেন তিনি, ‘প্রথম ম্যাচে কিছু খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সে আমি অত্যন্ত হতাশ ছিলাম। কারণ আমরা সবসময় কথা বলি দেশ, সমর্থক ও ফেডারেশনের জন্য মাঠে কতটা লড়াই করতে হবে। আমরা এখানে ছুটি কাটাতে আসিনি, উচ্চ র্যাঙ্কিংয়ের দলগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে এসেছি। মাঠে আট বা নয় জন খেলোয়াড় নিয়ে লড়াই করা যায় না, সবাইকে শতভাগ দিতে হয়। আজ প্রথম সেকেন্ড থেকেই প্রত্যেকে লড়াই করেছে, স্পেস বন্ধ করেছে এবং বলের পেছনে ছুটেছে।’
মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের খেলার ধরন নিয়েও সমালোচনা করেছেন ডুলি। বিশেষ করে অতিরিক্ত লং বল খেলার কারণে বলের দখল হারানোর বিষয়টি সামনে এনেছেন তিনি, ‘আমরা আগের ম্যাচের মতো শুধু লং বল খেলিনি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে লং বল প্রতিপক্ষের পায়ে চলে যায় এবং পরে সেই বলের পেছনে ছুটতে হয়। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে আমাদের খেলোয়াড়রা গড়ে ১০ হাজার মিটারের মতো দৌড়েছিল, যার মধ্যে ৮ হাজার মিটারই দৌড়াতে হয়েছিল বল তাড়া করতে গিয়ে। এটা কোনও ভালো খেলা নয়।’
বল নিজেদের দখলে রেখে পরিকল্পিত ফুটবল খেলাই তার লক্ষ্য জানিয়ে ডুলি বলেন, ‘আমি চাই দল বলের দখল রেখে খেলুক। দাবা খেলার মতো ফুটবলেও পরিকল্পনা করে খেলতে হয়। পরবর্তী দুই-তিন সেকেন্ডে কী হবে, সতীর্থরা কোথায় আছে, তা স্ক্যান করতে হয়।’
ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষেও সিঙ্গাপুর ম্যাচের মতো লড়াই চান ডুলি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্ট্রাইকার সংকটের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি, ‘আজকের খেলায় আমরা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ছিলাম এবং ৫০-৫০ বলগুলোতে জয়ী হয়েছি। আমাদের হয়তো ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো মানের কোনও অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার নেই। আশা করি ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচ থেকেও আমরা ইতিবাচক কিছু শিখতে পারব, যা আমাদের সাফে কাজে দেবে এবং ২০ বছর পর আবারও সাফ শিরোপা জয়ে ভূমিকা রাখবে।’