ইরানি জাহাজ জব্দ সম্পর্কে যা যা জানা গেলো

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানের জন্য পাকিস্তানে যখন আলোচনার প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই নতুন এক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার ভোরে উপসাগরের কাছে ইরানের একটি কন্টেইনারবাহী জাহাজ তুসকা আটক করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুদ্ধবিরতির আলোচনায় যোগ দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রতিনিধি দল যখন পাকিস্তানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই এই ঘটনা ঘটলো।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় মার্কিন নির্দেশ অমান্য করায় জাহাজটিতে আক্রমণ চালানো হয়েছে। গত সোমবার থেকে এই জলপথে মার্কিন নৌ-অবরোধ চলছে। এই ঘটনাকে ইরান ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং এর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরই তেহরান জানিয়ে দেয়, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তাদের কোনও প্রতিনিধি দল পাঠানোর পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত নেই।

চলমান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হাতে কোনও ইরানি বেসামরিক জাহাজ আটকের ঘটনা এটিই প্রথম। এছাড়া গত সপ্তাহে নৌ-অবরোধ শুরুর পর এটিই প্রথম ইরানি কার্গো জাহাজ মার্কিন বাহিনী আটক করলো।

কী ঘটেছিল?

সোমবার ইরানের মধ্যরাতের কিছু সময় পর সেন্টকম জানায়, তাদের গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস স্প্রুয়েন্স জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে ৫ ইঞ্চি (১২৭ মিমি) এমকে ৪৫ গান দিয়ে গুলি চালিয়ে সেটিকে অচল করে দেয়।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তুসকা আরব সাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে ইরানের বন্দর আব্বাসের দিকে যাচ্ছিল। গত ১৩ এপ্রিল থেকে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধ চলছে। এর আগে ইরান ওই সংকীর্ণ জলপথে অধিকাংশ জাহাজের চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল, কেবল সেই দেশগুলোর জাহাজ ছাড়া যারা তেহরানের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

মার্কিন নৌ-অবরোধ অনুযায়ী, ইরান বা ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী কোনও জাহাজ ওই প্রণালি দিয়ে যেতে পারবে না। এর ফলে ইরান অন্য দেশে তেল রফতানি করতে পারছে না। আল-জাজিরার হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন অবরোধের আগের মাসে ইরান তেল রফতানি করে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল।

সেন্টকম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী একাধিক সতর্কবার্তা দিয়েছিল এবং ইরান-পতাকাবাহী জাহাজটিকে জানিয়েছিল যে এটি মার্কিন অবরোধ লঙ্ঘন করছে। সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, টানা ছয় ঘণ্টা ধরে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও তুসকার ক্রুরা তা মেনে চলেনি। এরপর ইউএসএস স্প্রুয়েন্স জাহাজটিকে তার ইঞ্জিন রুম খালি করার নির্দেশ দেয়। এরপরই মার্কিন ডেস্ট্রয়ারটি ইরানি জাহাজটিতে গুলি চালায়।

পরবর্তীতে ৩১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটের মার্কিন মেরিন সেনারা তুসকায় উঠে জাহাজটি দখল করে নেয়। সেন্টকমের প্রকাশিত ঝাপসা ভিডিওতে দেখা গেছে, ইউএসএস ত্রিপোলি থেকে হেলিকপ্টারে করে মার্কিন সেনারা রশি দিয়ে তুসকা জাহাজে নামছে।

কী জানা যাচ্ছে ‘তুসকা’ সম্পর্কে?

জাহাজটি ইরান-পতাকাবাহী একটি কন্টেইনারবাহী জাহাজ। এটি ২৯৪ মিটার (৯৬৫ ফুট) লম্বা, যা মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের (৩৩২.৮ মিটার বা ১০৯২ ফুট) চেয়ে সামান্য ছোট। জাহাজটির প্রস্থ ৩২.২৫ মিটার (১০৫.৮ ফুট)।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ এবং অফিস অব ফরেন অ্যাসেট কন্ট্রোলের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় জাহাজটি ও এর মালিক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা ভাঙতে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। তুসকা কী বহন করছিল, তা এখনও অস্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, মার্কিন সেনারা জাহাজে কী আছে তা দেখছে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

সোমবার ভোরেই ইরান তুসকা আটকের ঘটনাকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করে। কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সাংবাদিকদের বলেন, পাকিস্তান যে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে প্রতিনিধি দল পাঠানোর কোনও পরিকল্পনা তেহরানের নেই। যদিও মার্কিন পক্ষ জানিয়েছিল, স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনারের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধি দল সোমবারই ইসলামাবাদ যাবে।

বাঘাই গত ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ইরান ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করে না। যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকদের সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কিন পক্ষ থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, কূটনীতির পথে চলার কোনও আন্তরিকতা তাদের নেই।

অন্যদিকে, ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, জাহাজ আটকের জবাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা আঘাত করবে। ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া-এর একজন মুখপাত্র বলেন, আমরা সতর্ক করছি যে, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই সশস্ত্র জলদস্যুতার দ্রুত জবাব ও প্রতিশোধ নেবে।

সংকট কীভাবে তীব্রতর হলো

বর্তমান অচলাবস্থা আরও তীব্র হয়েছে ১৮ এপ্রিল, ওই দিন ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ আরও জারি রাখে।

ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, এই অবরোধ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) অভিযোগ করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধের নামে জলদস্যুতা ও সমুদ্রে চুরি চালিয়ে যাচ্ছে।

আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, এ কারণে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই কৌশলগত জলপথ এখন সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

আইআরজিসি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে জাহাজ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির অবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে।

আলোচনার ভবিষ্যৎ ও সংঘাতের শঙ্কা

আগামী সোমবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে বসার কথা থাকলেও পরিস্থিতির কারণে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা না দেবে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।

মধ্যপ্রাচ্য কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্রের বিশ্লেষক আব্বাস আসলানি বলেন, উভয় পক্ষ আলোচনার আগে একে অপরের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত হামলার পরিকল্পনার বিপরীতে ইরান যদি কঠোর প্রতিশোধ নেয়, তবে এটি বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *