ড়যন্ত্র, ক্ষমতার লড়াই শেষে যেভাবে মোজতবা খামেনির হাতে এলো রাজদণ্ড

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির অভিষেক আপাতদৃষ্টিতে সহজ বা পূর্বনির্ধারিত মনে হতে পারে। কিন্তু পর্দার পেছনের প্রকৃত চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি কোনও মসৃণ উত্তরাধিকার ছিল না, বরং তার এই উত্থান ঘটেছে এক রক্তক্ষয়ী এবং তীব্র ক্ষমতার লড়াইয়ের পর। উত্তরাধিকার নিয়ে এই উচ্চপর্যায়ের লড়াই অনেকটা যেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রিপাবলিকের নিজস্ব ‘গেম অব থ্রোনস’। যেখানে একদিকে ছিল শূন্য সিংহাসন, অন্যদিকে ওলামা কাউন্সিল; আর ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল দুটি প্রভাবশালী বংশ, খামেনি ও খোমেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামরিক কমান্ডারদের নিজ নিজ প্রভাব রক্ষার লড়াই এবং একজন দুর্ধর্ষ সাবেক গোয়েন্দা প্রধানের মরণঘাতী চাল।

স্বাভাবিক সময়েও ইরানের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জিং কাজ হতো। কারণ এই পদের অধিকারী ব্যক্তি কেবল পৃথিবীতে ‘ঈশ্বরের প্রতিনিধি’ নন, বরং রাজনীতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে কয়েক দশকের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে ইরান শাসন করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন, যখন আকাশ থেকে বোমা পড়ছে আর মাটির নিচে চলছে একের পর এক বিস্ফোরণ, তখন আজীবনের জন্য একজন উত্তরসূরি নির্বাচন করা ছিল ইরানের ধর্মতন্ত্র টিকে থাকার এক চূড়ান্ত পরীক্ষা।

এই ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং নেপথ্যের ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা, দুজন আলেম, সর্বোচ্চ নেতার দফতরের সঙ্গে যুক্ত দুজন ব্যক্তি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) তিনজন সদস্যের সাক্ষাৎকারে। গোপনীয়তার স্বার্থে তারা সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, আয়াতুল্লাহ খামেনি যদি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করতেন, তবে সম্ভবত মোজতবা কখনোই এই পদে আসীন হতে পারতেন না। কারণ খামেনি তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের কাছে উত্তরসূরি হিসেবে যে তিনটি নাম দিয়েছিলেন, তাতে তার ছেলের নাম ছিল না।

বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদি। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

গোপন বৈঠক ও নেপথ্যের কলকাঠি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও আইআরজিসি জেনারেলরা। ৩ মার্চ অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেম একটি গোপন ভার্চুয়াল বৈঠকে বসেন। ওই দিনই ইসরায়েল কোম শহরে এই পরিষদের সদর দফতরে বোমা হামলা চালায়, যাতে বেশ কিছু প্রশাসনিক কর্মী নিহত হন।

কট্টরপন্থিরা চেয়েছিলেন খামেনির অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। তাদের পক্ষে ছিল রেভল্যুশনারি গার্ডস এবং এর নবনিযুক্ত প্রধান জেনারেল আহমদ ওয়াহিদি, জেনারেল মোহাম্মদ আলী আজিজ জাফারি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ। এই শিবিরের মূল মস্তিস্ক ছিলেন হোসেইন তায়েব। তিনি রেভল্যুশনারি গার্ডসের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান এবং বিদেশে গুপ্তহত্যা পরিকল্পনার কারিগর হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে, উদার বা মধ্যপন্থিরা চেয়েছিলেন একজন নতুন মুখ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনবেন। এই শিবিরের নেতৃত্বে ছিলেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তারা সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনির নাম প্রস্তাব করেন। আপস হিসেবে তারা আলিরেজা আরাফি নামে একজন আইনবিদের নামও সামনে আনেন।

জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

‘ভদ্রতাসূচক’ প্রত্যাখ্যান ও শেষ মুহূর্তের নাটক

৩ মার্চের প্রাথমিক ভোটে মোজতবা খামেনি প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সামরিক জেনারেলদের পাল্লাই ভারী। তবে আলী লারিজানি এই ঘোষণা স্থগিত করার নির্দেশ দেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ যেকোনও উত্তরসূরিকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন, তাই মোজতবার জীবন এখন ঝুঁকির মুখে। ৬ মার্চ ইসরায়েল সত্যিই তেহরানে সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডে বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা ফেলে সেটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। তবে মোজতবা সেখানে ছিলেন না।

এই সুযোগে মধ্যপন্থিরা মোজতবার নির্বাচন বাতিল করার শেষ চেষ্টা চালান। তারা দাবি করেন, সংবিধানে সরাসরি উপস্থিত হয়ে ভোট দেওয়ার কথা বলা থাকলেও ভার্চুয়াল ভোট অবৈধ। এছাড়া তারা আরও জানান যে, বিমান হামলায় আহত মোজতবা নিজেই এই পদ নিতে ইচ্ছুক নন। তবে মোজতবার ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ আবদোলরেজা দাভারি বলেন, “মোজতবা যখন তাকে নির্বাচিত হওয়ার কথা জানানো হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এটা গ্রহণ করতে চাই না, অন্য কাউকে বেছে নিন।’ এটি শিয়া আলেমদের মধ্যে ক্ষমতার প্রতি অনীহা প্রকাশের একটি প্রচলিত প্রথা বা ‘তায়ারুফ’। তারা প্রথমে না বললেও শেষ পর্যন্ত ঠিকই পদ গ্রহণ করেন।”

নাটকীয়তা আরও তুঙ্গে ওঠে যখন খামেনির দীর্ঘদিনের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী সামরিক উপদেষ্টা এবং চিফ অব স্টাফ আসগর হেজাজি একটি লিখিত ইচ্ছাপত্র পেশ করেন। সেখানে বলা হয়, আয়াতুল্লাহ খামেনিই তার পরিবারের কাউকে উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখতে চান না। কারণ বংশগত শাসন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের চেতনার বিরোধী, যা রাজতন্ত্র উচ্ছেদের জন্য হয়েছিল।

ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ফাইল ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

জেনারেলদের জয় ও মোজতবার অভিষেক

মধ্যপন্থিদের এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন রেভল্যুশনারি গার্ডসের জেনারেলরা। তারা একে একটি ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করেন। সাবেক গোয়েন্দা প্রধান হোসেইন তায়েব ব্যক্তিগতভাবে পরিষদের ৮৮ জন সদস্যকে ফোন করে জানান যে, মোজতবাকে ভোট দেওয়া তাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

অবশেষে ৮ মার্চ আবারও ভার্চুয়াল বৈঠক বসে। দীর্ঘ বিতর্কের পর আলেমগণ একমত হন যে, যুদ্ধকালীন প্রটোকল অনুযায়ী ভার্চুয়াল ভোট বৈধ এবং পূর্বসূরির ইচ্ছা পালনে তারা সাংবিধানিকভবে বাধ্য নন। সিলগালা করা খামে ব্যালট সংগ্রহ করার পর দেখা যায়, মোজতবা খামেনি ৫৯টি ভোট পেয়েছেন।

মধ্যরাতের ঠিক আগে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে ঘোষণা করা হয়, ইরান তার নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে পেয়েছে। যদিও ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনেইকে এই ঘোষণার পর এখনও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি, তবুও পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বর্তমানে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। এক রক্তক্ষয়ী উত্তরাধিকার যুদ্ধের পর খামেনি বংশের শাসনই আপাতত বহাল রইল ইরানে।

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *