‘তুমি তো মা, তোমার হৃদয়টা সাগরসমান’

মা মানেই আশ্রয়। কখনও কঠোর শাসন, কখনও বুকভরা মমতা, কখনও আবার নিঃশব্দে সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে থাকা। মা দিবসে সংগীতশিল্পী ঐশী ও তার মা নাসিমা মান্নানের কথায় উঠে এলো ঠিক এমনই এক সম্পর্কের গল্প—যেখানে আছে শাসনের ভয়, বন্ধুত্বের উষ্ণতা, দূরে থাকার কষ্ট আর অশেষ কৃতজ্ঞতা।

ঐশীর কাছে মায়ের স্মৃতি এক বিশাল অ্যালবাম। কোনটা রেখে কোনটা বলবেন, সেটাই বুঝে উঠতে পারেন না তিনি। “তোমার সঙ্গে শৈশবের তো আসলে হাজার না, মনে হয় কোটি কোটি স্মৃতি”—বলতে বলতেই যেন ফিরে যান সেই ছোট্টবেলায়। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে দিনের প্রতিটি ঘটনা মাকে বলা পর্যন্ত তার শান্তি হতো না। ক্লাসে কী হলো, কার সঙ্গে ঝগড়া হলো, কী খেলো—সব কিছুই প্রথম শুনতে হতো মাকে।

ঐশী বলেন, “আমার ওরকম ছিল যে বাসায় এসে আম্মুকে সব বলার আগ পর্যন্ত খাবারও হজম হতো না।” মজার বিষয় হলো, সময় বদলেছে, বয়স বেড়েছে, পরিচিতি বেড়েছে—কিন্তু সেই অভ্যাস বদলায়নি। এখনও অনেক কথা জমে থাকে, আর মায়ের সঙ্গে দেখা হলেই এক নিশ্বাসে সব বলে ফেলতে ইচ্ছে করে তার।

মায়ের সঙ্গে ঐশী

 

রংপুরের শৈশবের কথা মনে করতে গিয়ে ঐশীর কণ্ঠে ধরা পড়ে নরম এক আবেগ। ক্লাস প্লে, নার্সারি কিংবা কেজির সেই দিনগুলোতে পড়াশোনা নিয়ে মায়ের শাসন ছিল ভয়ংকর। কখনও বকা, কখনও মারও খেয়েছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কিছুক্ষণ পর সেই মাই-ই আবার তাকে কোলে তুলে বুকের মধ্যে জড়িয়ে আদর করতেন। “আম্মু বলতো, পড়াশোনা করলে কি মা মাইর দেয়”—এই কথাটা আজও স্পষ্ট মনে আছে তার। ছোট্ট ঐশী তখন আরও বেশি কান্না করতেন। কারণ যে মা একটু আগে বকেছেন, সেই মা-ই আবার চোখ মুছে দিচ্ছেন ভালোবেসে।

ঐশীর ভাষায়, মা যেমন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন, তেমনি সবচেয়ে বড় ভয়ও ছিলেন। বাবা শাসন করলেও মায়ের রাগটাই নাকি বেশি ভয় পেতেন তিনি। ছোটবেলায় মায়ের হাতে প্রচুর মার খাওয়ার গল্প বলতে বলতেও হাসছিলেন তিনি। আবার শাসন খাওয়ার পর বাবার কাছে নালিশ দিতেন, এরপরই হতো অপরাধবোধ। মনে হতো, মায়ের নামে নালিশ দেওয়া ঠিক হয়নি। তারপর আবার একটু পরই মা-মেয়ের খুনসুটি, অভিমান, আদর—সব ঠিক হয়ে যেত।

মায়ের সান্নিধ্যে শৈশবের ঐশী

 

আজকের সংগীতশিল্পী ঐশী, চিকিৎসক ঐশী কিংবা মানুষ হিসেবে ঐশী—এই পুরো যাত্রার পেছনে মা-বাবার অবদানকে সবচেয়ে বড় বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে মায়ের কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। “আম্মু ছাড়া আমার কিছুই হয় না”—এই একটি বাক্যেই ধরা পড়ে তার নির্ভরতার গভীরতা।

গানের ব্যস্ত জীবন আর ডাক্তারি—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ একসঙ্গে সামলাতে এখনো মায়ের ওপর নির্ভর করেন ঐশী। কোন অনুষ্ঠানে কী পোশাক পরবেন, কোথায় কখন যেতে হবে, কীভাবে সব সামলাতে হবে—অনেক কিছুই এখনো মা দেখেন। “আমার ম্যানেজমেন্টও আম্মু করে”—হেসে বললেও কথার ভেতর ছিল গভীর ভালোবাসা। তার মতে, মায়ের সহযোগিতা ছাড়া এই দুই জীবন একসঙ্গে চালিয়ে নেওয়া তার পক্ষে কখনও সম্ভব হতো না।

বিয়ের পর মাকে ছেড়ে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়েও অকপটে কথা বলেন তিনি। ঐশী জানান, বিয়ের আগের রাত পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারেননি জীবনটা কত বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। কিন্তু যেদিন শ্বশুরবাড়িতে থাকা শুরু করলেন, সেদিনই প্রথম বুঝলেন মা আর পাশে নেই। সেই শূন্যতা আজও তাকে তাড়া করে ফেরে।

 

বিয়ের আসরে ঐশী, সঙ্গে মা

 

তিনি বলেন, এখনো প্রতিবার মা বা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে বাসায় ফেরার সময় তার ভীষণ খারাপ লাগে। “মনে হয়, ইশ! আরও কিছুক্ষণ যদি থাকতাম”—এই ছোট্ট অনুভূতিটুকুই যেন মেয়ে হয়ে ওঠার পরও মায়ের কাছে ছোট্ট শিশুই থেকে যাওয়ার গল্প বলে।

মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষার কথা বলতে গিয়ে ঐশী বলেন, সততা, দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা আর কাজের প্রতি নিষ্ঠা—এসবই তিনি শিখেছেন মায়ের কাছ থেকে। তার ভাষায়, “মা-ই আমাকে ঐশী বানিয়েছেন।”

অন্যদিকে মা নাসিমা মান্নানের কাছেও ঐশী এখনো সেই ছোট্ট মেয়েটিই। “ছোট্ট ঐশী বড় হয়ে গেল, কিন্তু আমাদের কাছে সে এখনো ছোট্ট ঐশী”—বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ছোটবেলায় ঐশী খুব চঞ্চল আর ভীষণ মিশুক ছিল। কোনও অতিথি বাসায় এসে তাকে কোলে না নিলে নাকি কান্না জুড়ে দিতো।

প্রথম সন্তান হিসেবে ঐশীকে ঘিরেই ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। তার প্রথম হাঁটা, প্রথম হাসি, প্রথম ডাক—সব কিছুই ছিল বাবা-মায়ের কাছে বিশেষ এক অনুভূতি। তবে দুষ্টুমিও কম ছিল না। নাসিমা মান্নান মজা করে বলেন, “যে পৃষ্ঠা পড়তে ভালো লাগতো না, সেটা ছিঁড়ে লুকিয়ে রাখতো।”

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি গান, আবৃত্তি, ড্রয়িংসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন ঐশী। মেয়ের শেখার গতি আর আগ্রহ দেখে ধীরে ধীরে মা-বাবা বুঝতে পারেন, তার মধ্যে আলাদা এক প্রতিভা আছে। এরপর মানুষের প্রশংসা বাড়তে থাকলে তাদের স্বপ্নও বড় হতে থাকে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, সঠিক সুযোগ আর উৎসাহ পেলে মেয়েটি অনেক দূর যাবে।

নাসিমা মান্নান বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া ছিল, সে যেন একজন ভালো মানুষ হয় এবং নিজের প্রতিভা দিয়ে সমাজে আলাদা একটা পরিচয় তৈরি করতে পারে।” আর সেই বিশ্বাসটা সবচেয়ে বেশি ছিল ঐশীর বাবার।

আজ যখন হাজারো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত একজন শিল্পী ও চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ঐশী, তখনও তার কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি তার মায়ের “ছোট্ট কলিজা মেয়েটা”।
মা দিবসে মায়ের উদ্দেশে ঐশীর বার্তাটি যেন এক টুকরো চিরকুট—ভালোবাসা, অনুশোচনা আর কৃতজ্ঞতায় ভরা—

মা,
বড় হতে হতে অনেক ভুলভাল করেছি। কতবার তোমার মনে কষ্ট দিয়েছি। কখনও নিজে বুঝতেও পারিনি যে আমি ভুল করেছি, কখনও বা বুঝতে পেরে তোমার কাছে মাফ চেয়ে নিয়েছি। তুমি তো মা, তোমার হৃদয়টা সাগরসমান। তুমি সন্তানের সব ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে সন্তানকে বুকে আগলে রাখো। তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি। তোমার কাছ থেকে দূরে থাকার পর সেই ভালোবাসা আরও বেশি অনুভব করি। তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা কখনও বলে শেষ করতে পারবো না। সন্তান হিসেবে যে ভুল-ত্রুটি করেছি কিংবা সামনেও যদি কখনও করি, তোমার একমাত্র ছোট্ট কলিজা মেয়েটাকে ক্ষমা করে দিও। মা, সারা জীবন আমার সঙ্গে থেকো। আই লাভ ইউ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *