দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনায় ‘বাংলাদেশ সনদ’। এর মাধ্যমে নাগরিক অধিকার, জাতীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। গত ২৬ মার্চ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত ফরম ছেড়ে সদস্য আহ্বান করা হচ্ছে। কেউ কেউ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। ইতোমধ্যে তাদের পেইজে ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।
তবে এর নেপথ্যে কারা রয়েছেন, কী তাদের লক্ষ্য—এ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। এটি কি সংবিধানের বিকল্প, নাকি পরিপূরক? কারা এই সনদ প্রণয়ন করছেন এবং কতটা অংশগ্রহণমূলক- এ প্রশ্নও সামনে আসছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিগত দিনে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিক্রি করে রাজনীতি করেছে। আর এখন জুলাইকে পুঁজি করে চলছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। অপরদিকে ‘বাংলাদেশ সনদ’ নাম দিয়ে আরেকটি শক্তি সামনে আসার চেষ্টা করছে। তারা এটি সংবিধান নাকি বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা পরিষ্কার নয়।
তবে তারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও তাদের ৮ দফা অঙ্গীকারে বাহাত্তরের মূলনীতির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত যেমন একাত্তরের গণহত্যার জন্য দায়ী, তেমনই আওয়ামী লীগও জুলাই গণহত্যার জন্য দায়ী। কিন্তু ‘বাংলাদেশ সনদ’-এর উদ্যোক্তারা জুলাই গণহত্যার বিষয়ে কোনও কথা বলেননি। আমরা মনে করি, বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে একাত্তরের পাশাপাশি চব্বিশকেও ধারণ করতে হবে। অন্যথায়, তারা যত ভালো কথাই বলুক, কোনও কাজে আসবে না।’’
কী আছে ‘বাংলাদেশ সনদে’?
প্রস্তাবিত এই সনদে দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। ফেসবুক লাইভে এই ফোরামের সদস্য আরিফুজ্জামান নাঈম জানান, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারা ৮টি অঙ্গীকার নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান। এগুলো হলো—একাত্তরের গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ, জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, ন্যায়পরায়ণতা, গণতন্ত্র ও সুশাসন।
তাদের দৃষ্টিতে এটি এক সময় আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার দলীল হিসেবে ভিত্তি গড়তে পারে। হতে পারে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের দিকনির্দেশনা। একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো বা অভিন্ন নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা, নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে যাতে আগ্রহ বাড়ে—এ জন্য এই সনদ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।
এছাড়া স্বাধীনতার মূল চেতনা এবং সংবিধানের আদর্শকে নতুনভাবে পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা হিসেবেও দেখছেন উদ্যোক্তারা । প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার। সদস্য ফরমে উল্লেখ করা হয়—উপরোক্ত বিষয়ে আপনি একমত হলে স্বাক্ষর করুন, না হলে নিজের ভাবনা লিখুন।
আসল উদ্দেশ্য কী? নেপথ্যে কারা?
বাংলাদেশ এর নাম দিয়ে সামনে আসা এ সনদটির আসল উদ্দেশ্য কী? এর মূলে কারা এবং কতটা অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় তা হচ্ছে? বিশ্লেষকরা বলেন, সনদটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলে তা নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে। অপরদিকে সমর্থকদের দাবি, একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য সনদই রাজনৈতিক বিভাজন কমাতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যেকোনও সনদ তখনই কার্যকর হয়, যখন তা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ থাকে। এটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে পদ্ধতি নিয়েও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।
এর সঙ্গে কারা জড়িত এ নিয়ে তেমন কারও নাম জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে—এর পেছনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কিছু অ্যাক্টিভিস্ট সম্পৃক্ত রয়েছেন। আবার কেউ কেউ তা নাকচ করে বিভ্রান্তিকর হিসেবে উল্লেখ করেন।
নিজেদের পেজ থেকে এর অন্যতম উদ্যোক্তা মহিউদ্দিন ফারাহ লাইভে জানান, তার বাড়ি সিলেটে। তিনি বলেন, ‘‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতার চেতনা থেকেই তারা এ উদ্যোগ নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে কারও কাছে মাথা নত করা নয়। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দেওয়া।’’ তিনি বলেন , একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যমূলক বাংলাদেশ গড়তেই তাদের এ উদ্যোগ। তারা বঙ্গবন্ধুর মতো শক্তিশালী ও গর্বিত বাংলাদেশ গড়তে চান।
তবে ‘বাংলাদেশ সনদ’-এর নামে এ ধরনের তৎপরতা নিয়ে সম্প্রতি আওয়ামী লীগ ঘরানার অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ব্যারিস্টার অ্যান্ড সলিসিটর নিঝুম মজুমদার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘‘বাংলাদেশ সনদে বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্রসহ মৌলিক স্তম্ভ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, ৩০ লাখ শহীদ, নির্যাতিত নারী ও মুক্তিযুদ্ধের স্পষ্ট ইতিহাস নেই— যা খুবই বিস্ময়কর। এতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানের স্বীকৃতিও নেই, যা বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে।’’ তবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্য গড়ে তুলে সম্মিলিতভাবে কাজ করা সময়ের দাবি বলে তিনি মনে করেন।
আরেক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক ফেসবুকে পোস্টে লিখেছেন—‘‘৫ আগস্ট-পরবর্তী অস্থিরতার মধ্যেই ‘বাংলাদেশ সনদ’-এর ধারণা উঠে আসে— মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা স্পষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে। নানা বিতর্ক থাকলেও এটি কোনও সংবিধানের বিকল্প নয়, বরং কেমন বাংলাদেশ চাই— তার একটি ন্যূনতম যৌথ অবস্থান।’’
কী দৃষ্টিতে দেখছেন রাজনীতিবিদরা
‘বাংলাদেশ সনদ’-এর তৎপরতা বেশি দিন না হলেও ধীরে ধীরে এটি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। তবে এটি বাস্তবে রূপ পাবে কিনা, নাকি শুধু আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে—তা নির্ভর করছে জনমত ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ গণহত্যায় সম্পৃক্ততার কারণে গণধিকৃত। তাই তারা দলীয় নামে কোথাও তৎপরতা চালালে গণরোষের মুখে পড়তে হচ্ছে। তারা অতীতে আসলে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে কোনও কাজ করেনি। সব সময় দিল্লির পক্ষে ভূমিকা রেখেছে। তাই নতুন করে বিভিন্ন নামে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা মনে করি, দেশবিরোধী এই অপশক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’’
এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘‘তাদের আসল উদ্দেশ্য কী, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদ বলতে তারা কী বুঝাতে চায়, তা আরও পরিষ্কার করতে হবে।’’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিষয়টি নিয়ে আমি বিস্তারিত অবগত নই। তবে দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনও অপতৎপরতা প্রতিহত করতে হবে।’’