বন্দর খাতে বড় দুর্নীতির অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও শিপিং খাতজুড়ে বড় ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রভাব বাণিজ্যের অভিযোগে নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে চুক্তি প্রদান ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২২-২৩ সালে এস এম মনিরুজ্জামান বিএসসির এমডি থাকাকালে জাহাজ কেনাসহ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে।

দুদকের অনুসন্ধানে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি, প্রভাব খাটিয়ে ঠিকাদার নির্বাচন এবং নিয়োগে যোগ্যতার পরিবর্তে পক্ষপাতিত্বের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। বিশেষ করে বড় প্রকল্পগুলোতে পূর্বনির্ধারিত ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন বা শিথিল করার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এস এম মনিরুজ্জামান ২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি জাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিলেও শেষ পর্যন্ত কেনা হয় ৪টি। এতে প্রায় ৪৮৬ কোটি টাকার আর্থিক অসঙ্গতির তথ্য পেয়েছে দুদক।

একই সময়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি অপরিশোধিত তেল পরিবহন চুক্তিতে বাজারদরের তুলনায় প্রতি মেট্রিক টনে ৩০ থেকে ৪০ মার্কিন ডলার বেশি পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বছরে কয়েকশ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরপরই তার ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সদস্যদের বিদেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে। জানা গেছে, তার ছেলে মুহতাসিম ইয়াসার নিউইয়র্ক ও দুবাইয়ে নরভিক শিপিং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পেশাগতভাবে যুক্ত হন। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার চুরি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরির অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে দুদক।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রকল্প ও চুক্তি থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বেনামে সম্পদ ক্রয় এবং বিদেশে পাচারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা শহরে ‘মুকুল কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একাধিক আবাসিক সম্পদ কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা কাজী মুকুল। এসব সম্পদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নামে নিবন্ধিত হলেও অর্থের উৎস ও স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় গুরুতর অসঙ্গতি শনাক্ত করেছে দুদক।

ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনও সামঞ্জস্য নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মো. সাজিদ হাসান ও তানজিম হাসানের নামে সম্পদগুলোর মালিকানা ও বসবাসের তথ্য পাওয়া গেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অবস্থান করছেন।

এ ঘটনায় উপ-পরিচালক মো. নাজমুচ্ছায়াদাতকে প্রধান করে চার সদস্যের অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে দুদক। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন— উপ-পরিচালক তানজির হাসিব সরকার, সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ এবং আবু বকর সিদ্দিক।

দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একাধিক বড় প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়নে অসঙ্গতি, প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার সীমিত রাখা, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে শর্ত সাজানো, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি এবং কাজের মান যাচাইয়ে গাফিলতির মতো অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, ড্রেজিং এবং জাহাজ ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পগুলোতে এসব অনিয়মের মাত্রা বেশি।

নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও একই চিত্র দেখা গেছে। লিখিত পরীক্ষার ফল পরিবর্তন, মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব খাটানো, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ এবং বিজ্ঞপ্তির শর্ত পরবর্তীকালে পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। সামগ্রিকভাবে, দেশের বন্দর ও শিপিং খাতে দুদকের এই অনুসন্ধানকে বড় ধরনের দুর্নীতি উন্মোচনের সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপ-পরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, ‘‘কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং প্রকল্পসহ চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক প্রকল্পে চুক্তি, নিয়োগ ও ব্যয় সংক্রান্ত গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ শুরু হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা মিললে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *