মিয়ানমারের সরকার স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়িয়েছে। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সামরিক বাহিনী দাবি করছে যে, বিদ্রোহী যোদ্ধারা এসব পণ্য প্রাথমিক চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করছেন। ২০২১ সালে গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিয়ানমারে যে গৃহযুদ্ধ চলছে, তার অংশ হিসেবেই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন সিস্টার্সটুসিস্টার্স-এর পরিচালক থিনজার শুনলেই ই বলেন, সামরিক বাহিনী বলছে যে, পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) সদস্যরা মাসিককালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পণ্যগুলোকে চিকিৎসাগত কারণে ব্যবহার করছে। এমনকি জুতার ভেতরে ঘাম ও রক্ত শোষণের জন্যও তারা এগুলো ব্যবহার করছে বলে জান্তা দাবি করছে।
এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও, ফোর কাটস নামের একটি কৌশলের অংশ হিসেবে এই অবরোধ চলছে। বিদ্রোহীরা যাতে মৌলিক সরবরাহ না পায়, তা নিশ্চিত করাই এই কৌশলের লক্ষ্য। আগস্ট মাস থেকে বেশ কিছু এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। সাগাইং ও মান্দালয়ের মধ্যে সংযোগকারী সেতু দিয়ে স্যানিটারি প্যাড পরিবহন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। থিনজার শুনলেই ই-এর মতে, এই নিষেধাজ্ঞা এ বছর আরও বিস্তৃত করা হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে সমাজে ট্যাবু থাকায় অনেকেই তা বুঝতে পারছে না।
চিকিৎসা সহায়তাকারী দাতব্য সংস্থা স্কিলস ফর হিউম্যানিটি (এসএফএইচ)-এর প্রতিষ্ঠাতা মেরেডিথ বান জানান, যারা যুদ্ধক্ষেত্রের চিকিৎসা নিয়ে কাজ করেছেন, তারা জানেন স্যানিটারি ন্যাপকিন গুলির ক্ষত বা আঘাতের চিকিৎসায় ব্যবহার করা অসম্ভব। তিনি বলেন, স্যানিটারি প্যাড ক্ষতস্থানে আটকে থাকে না, পর্যাপ্ত রক্ত শুষে নিতে পারে না এবং ক্ষতস্থান পরিষ্কারও রাখতে পারে না।
তিনি এই নিষেধাজ্ঞার জন্য সামরিক বাহিনীর “সম্পূর্ণ অশিক্ষিত এবং নারীবিদ্বেষী মূর্খদের” দায়ী করেন।
মিয়ানমারে পিরিয়ড শিক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থা পান কা লে-এর প্রতিষ্ঠাতা হেনরিটে সেয়ারাক জানান, স্যানিটারি প্যাড না পাওয়ায় নারীরা বাধ্য হয়ে পুরোনো কাপড়, পাতা বা খবরের কাগজের মতো অনিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করছেন, যা তাদের নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে। তিনি বলেন, এটি মূত্রনালির সংক্রমণ, প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণসহ শারীরিক যন্ত্রণা ও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিকল্প পণ্যের অভাবে কালোবাজারে এসব পণ্যের দাম তিন গুণ বেড়ে গেছে। থিনজার শুনলেই ই জানান, আগে যে প্যাডের দাম ছিল ৩ হাজার কিয়াত (১ পাউন্ড), তা এখন ৯ হাজার কিয়াতে বিক্রি হচ্ছে। অথচ মিয়ানমারের দৈনিক ন্যূনতম মজুরি মাত্র ৭ হাজার ৮০০ কিয়াত। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। সিস্টার্সটুসিস্টার্স-এর কাছে নিয়মিত ইউটিআই-এর চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা আসছে। নারীরা অস্বস্তি ও যন্ত্রণায় ভুগছেন এবং মাসিক চলাকালীন তারা ‘রাজনৈতিক কার্যক্রমে’ অংশ নেওয়ার চেয়ে ঘরে থাকাকেই নিরাপদ মনে করছেন।
হেনরিটে সেয়ারাক মনে করেন, সামরিক বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবেই নারীদের চলাচলের স্বাধীনতাকে আরও সংকুচিত করতে চায়। তিনি একে ‘লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। মেরেডিথ বানের মতে, এটি সামরিক বাহিনীর এমন একটি কৌশল, যার লক্ষ্য নারী যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তু করা, সাধারণ নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাস্তুচ্যুত শিবিরে থাকা নারীদের দুর্দশাগ্রস্ত করা। ২০২১ সাল থেকে মিয়ানমারে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
সেখানে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য প্যাড বিতরণের চেষ্টা করছে। তবে পর্যাপ্ত পানি ও ধোয়ার ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলোও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মিয়ানমারে পিরিয়ড কাপ বা ট্যাম্পনের মতো পণ্যও খুব একটা সহজলভ্য নয়। হেনরিটে সেয়ারাক বলেন, নারীদের এসব বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া বা সচেতন হওয়াকে ভালোভাবে দেখা হয় না।
পিরিয়ডকে এখানে লজ্জার বিষয় মনে করা হয় এবং নারীদের এ সংক্রান্ত সব প্রমাণ লুকিয়ে রাখতে উৎসাহিত করা হয়। থিনজার শুনলেই ই জানান, স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতিসংঘকে সতর্ক করেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্য নিষিদ্ধ করাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান