বৈরুতে হামলা চালিয়ে ইরান-মার্কিন আলোচনা ভেস্তে দিতে কি পারবে ইসরায়েল

ইসরায়েল লেবাননে হামলা তীব্র করছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৈরুতে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির মধ্যে এমন হামলার নির্দেশে ইসরায়েলের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলের হামলা তীব্র করার পেছনে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আলোচনা প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দেওয়া কিংবা ইরানের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টির লক্ষ্য থাকতে পারে। এছাড়া নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রকল্পের যোগসূত্রও উড়িয়ে দেননি বিশ্লেষকরা।

কাতার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বান্দার আল এতাইবি মনে করেন, ইসরায়েল ভালো করেই জানে যে, ইরানকে সরাসরি স্পর্শ না করে তাকে আঘাত করার জন্য এটিই সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা।

আল এতাইবি বলেন, এই হামলার ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তা ইসরায়েলের ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে তারা আবার যুদ্ধে ফিরে যাবে। এটি ইসরায়েলের লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ; যদি তারা লেবাননকে চরম সংকটে ঠেলে দিয়ে গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি করতে পারে, সেটা হবে তাদের জন্য আরও ভালো। আর যদি এই বিকল্পগুলোর কোনোটিই কাজ না করে, তবে তারা দেশটির দক্ষিণে আরও বেশি বসতি স্থাপন করবে, তাতেও তারা কিছু একটা অর্জন করতে সক্ষম হবে।’

তিনি আরও জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন বিষয়ে ইসরায়েলের ওপর আরোপিত সীমারেখাগুলো পুনর্বিবেচনা করেছেন। কারণ মার্কিন প্রশাসন এখন বুঝতে পেরেছে যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ইরানের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এই হামলা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার নির্দেশ তেহরানকে আবারও ‘যুদ্ধে ফিরে যেতে বাধ্য করতে পারে এবং এর ফলে ইরান যুদ্ধের জন্য দায়ী হয়ে পড়বে, অথবা এটি ইরান-লেবানন অক্ষকে বিভক্ত করবে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ থেকে আল-জাজিরার নিদা ইব্রাহিম জানিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননে এই উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়টিকে উত্তর ইসরায়েলের বসতিগুলোকে রক্ষা করার একটি উপায় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। দীর্ঘদিন ধরে ড্রোন ও রকেট হামলার শিকার হওয়া ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা অভিযোগ করে আসছিলেন যে, নেতানিয়াহু তাদের রক্ষা করতে বা হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা এবং উত্তর অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন।

যদিও এই ধরনের পদক্ষেপ উত্তর ইসরায়েলের বসতিগুলোতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর হাতে ইসরায়েলি সেনাদের হতাহতের ঘটনায় দেশের ভেতরেওও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

নেতানিয়াহু জানেন যে, লেবাননে এই উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য চলমান আলোচনা পথচ্যুত হতে পারে। আর যেকোনও চুক্তি নস্যাৎ করা নেতানিয়াহুর নিজস্ব স্বার্থেরই অনুকূল।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, ইসরায়েলের ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ নামের পরিকল্পনা আমাদের দৃষ্টির আড়াল করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘লেবাননে বর্তমান আগ্রাসনের পেছনে তাদের একাধিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এর একটি ভূখণ্ড সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসরায়েলিদের নজর অন্তত দক্ষিণ লেবাননের ওপর রয়েছে, সম্ভবত লিটানি নদীর দক্ষিণের এলাকা এবং সম্ভবত তারও বাইরে। তবে এটি তাদের প্রকল্পেরই অংশ।’

এলমাসরি আরও বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলি নেতাদের মুখে এই বৃহত্তর ইসরায়েল প্রকল্পের কথা বারবার উল্লেখ করতে শুনছি এবং ইসরায়েলি গণমাধ্যমেও এটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা দেখছি তারা গাজায় তাদের নিয়ন্ত্রণ ৫৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করছে এবং নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন এটি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত করার।’

লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক জাদ মেলকি বলেছেন, লেবাননে সামরিক কৌশলের দিক থেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মূলত ‘আটকে গেছেন’।

মেলকি জানান, ইসরায়েলের অধিকাংশ হামলা চালানো হচ্ছে টায়ার শহরের বেসামরিক কেন্দ্র, দক্ষিণ লেবাননের গ্রাম এবং বফোর্ট দুর্গের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে।

তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু এগুলোর বেশিরভাগকেই বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে জাহির করেছেন, কিন্তু সেগুলোর সিংহভাগই অতিরঞ্জিত। এমনকি বফোর্ট দুর্গের কথাই যদি ধরা হয় তাহলে এখন এটি আর কোনও কৌশলগত সামরিক অবস্থান নয়।’

মেলকি বলেন, ‘সমস্যা হলো নেতানিয়াহু আটকে গেছেন। তিনি খুব দ্রুত অগ্রসর হতে পারছেন না, কারণ এতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ভেঙে পড়বে। আবার তিনি দক্ষিণ লেবাননের অধিকৃত অঞ্চলে স্থির হয়ে বসেও থাকতে পারছেন না, কারণ প্রতিরোধ যোদ্ধারা সেখানে তার সেনাদের পাখির মতো শিকার করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *