যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে কতদিন টিকবে ইরান

ইরানের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো তেল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের রফতানি বন্ধ ও উৎপাদন থামিয়ে দেওয়ার যে অবরোধ আরোপ করেছেন, তা এখনই পূর্ণ সফল হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবরোধের মুখেও আপাতদৃষ্টিতে টিকে থাকার মতো কিছু কৌশল ইরানের হাতে এখনও আছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধের কারণে ইরানের তেল উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার মতো ‘আসন্ন বিপদ’ হয়তো এখনই নেই। জলবায়ু ও জ্বালানি বিষয়ক ডেটা অ্যানালিটিক্স ফার্ম কায়রোস-এর প্রধান বিশ্লেষক অঁতোয়ান হাফ বলেন, কোভিড সংকটকালে ইরান যেভাবে মজুত গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল, পাশাপাশি গত ১০ বছরে তারা বিকল্প মজুত ও রফতানি অবকাঠামো বাড়াতে যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তা তাদের এই সংকটকালীন সময়ে সহায়তা করছে। কিন্তু ইরানের তেল অবরোধের সহ্যক্ষমতা কতটুকু, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

এর আগে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ধারণা করা হয়েছিল, ইরানের কাছে যে পরিমাণ মজুত আছে, তাতে মাত্র দুই সপ্তাহ উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু এই হিসাবকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, ওই ধারণাটি ছিল এমন যে, এই সময়ে ইরান এক ফোঁটাও তেল রফতানি করতে পারবে না। বাস্তবে তা হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

পণ্য ট্র্যাকিং ও অ্যানালিটিক্স ফার্ম ভর্টেক্সা-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক রোহিত রাঠোর জানান, ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানের কাছে ২০টি বিশালাকার তেলবাহী জাহাজের সুবিধা ছিল, যার প্রতিটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ধারণে সক্ষম। তিনি বলেন, এই জাহাজগুলোকে ভাসমান মজুত হিসেবে ব্যবহার করে ইরান তেল উৎপাদন আরও প্রায় দুই মাস চালিয়ে নিতে পারে। এছাড়া ভর্টেক্সার হিসাব অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানের কাছে অন্তত তিন সপ্তাহ উৎপাদনের সমপরিমাণ স্থলভাগের মজুত ছিল।

ইরানের অভ্যন্তরীণ কৌশল সম্পর্কে বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু আরও বলেন, তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে চাপের বিপর্যয়কর ক্ষতি ছাড়াই ইরান উৎপাদন কমিয়ে আনতে সক্ষম। এছাড়া ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর হাতে তেল পাচার বা ছোট ট্যাঙ্কারে তেল বিক্রির মতো আয়ের বিকল্প উৎস রয়েছে। ব্রু বলেন, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ যদি সম্পূর্ণ সফলও হয় তবুও আইআরজিসি তাদের সেনাদের বেতন দেওয়া এবং নিজের অবস্থান সুরক্ষিত রাখার জন্য এই বিকল্প আয়ের ওপর নির্ভর করতে পারবে। বাস্তবে এখনও মার্কিন অবরোধ পুরোপুরি সফল হয়নি।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, অবরোধের ফলে ইরানে তেল উৎপাদন সীমিত হয়ে পড়েছে এবং এটি নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি একটি জোড়া আঘাত হিসেবে কাজ করছে। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিসের বিশেষজ্ঞ মিয়াড মালেকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, ইরানের মজুত কৌশল মূলত কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং কয়েক দিনের বিলম্ব ঘটানোর কৌশল মাত্র।

এদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোও উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ তাদের রফতানির পথ রুদ্ধ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি না করে তেল উৎপাদন পুনরায় শুরু করা বেশ জটিল। এ কারণেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি খুব দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পাইপলাইনগুলোও এখন বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

সূত্র: অ্যাক্সিওস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *