হাসপাতালের মেঝেতে রোগীর শুয়ে থাকার দৃশ্য লজ্জাজনক: বিরোধীদলীয় নেতা

দেশের পল্লী-স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী মেঝেতে শুয়ে থাকার দৃশ্যকে অত্যন্ত ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। স্বাস্থ্য খাতকে ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’ ও জোড়াতালির নীতিতে চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন প্রজেক্টের চেয়ে বিদ্যমান জনবল ও লজিস্টিক সংকট দূর করে হাসপাতালগুলোর মান ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় জরুরি।

সোমবার (২৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া সংসদের বৈঠকের এ পর্যায়ে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

ড. শফিকুর রহমান বলেন, চলমান বাজেট অধিবেশনে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। দেশের বাজেট হতে হবে ইনসাফভিত্তিক, যেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ ও অঞ্চলের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমান বাজেটে তার বড় ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমাজে উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব। পদ্ধতিগতভাবে কোনো একটি এলাকা থেকে এই অসততা ও স্বচ্ছতার অভাব দূর করার উদ্যোগ নিলে তবেই জাতি এর সুফল পাবে। প্রযুক্তির সহায়তায় অন্তত ২০ দিন আগে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া যায়, সেখানে তিন মাস আগের সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাসের মাধ্যমে বাজেটের অপচয় ও লুটপাটের সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে ড. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার নিজে সৎ এবং সদিচ্ছাসম্পন্ন হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করতে হবে যে তাদের তিন জায়গায় ট্যাক্স দিতে হবে না। বর্তমানে ব্যবসায়ীরা সরকারি কোষাগার ছাড়াও অসৎ কর্মকর্তা এবং চাঁদাবাজদের পকেটে কর দিতে বাধ্য হন। ব্যবসায়ীদের যদি নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যে কর শুধু একটিই হবে এবং বিপদে রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে, তবে সৎ ব্যবসায়ীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে আরও বেশি কর দেবেন।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ বছরে মাত্র গুটি কয়েক অসৎ ও লুটেরা ব্যবসায়ীর হাতে দেশ লুণ্ঠিত হয়েছে, যাদের আমরা সবাই চিনি কিন্তু অনেকেই তাদের সাথে গলাগলি করি। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া ২৮ লক্ষ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনার কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এই বাজেটে নেই। পাচার হওয়া এই বিপুল অর্থের মাত্র নয় ভাগের এক ভাগ যদি আগামী অর্থ বছরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে দেশে কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না। শুধু অর্থ ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়, বরং এই অপরাধীদেরও দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ডাকাত তৈরি হবে। এই প্রক্রিয়া যেন কচ্ছপ গতিতে না চলে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে দ্রুত আইনি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করার জোর তাগিদ দেন তিনি।

ক্ষমতার পালাবদল কখন কার মাধ্যমে হবে তা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে বিরোধী দল হিসেবে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক মহলে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত আছেন।

দেশের স্বাস্থ্য খাতের কড়া সমালোচনা করে চিকিৎসা শাস্ত্রের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবস্থা অত্যন্ত করুণ, যা সাধারণ মানুষ প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছে। ভিআইপিরা সিএমএইচ-এ চিকিৎসা পাওয়ায় সাধারণের দুর্ভোগ হয়তো তাদের অনুধাবন করা কঠিন। দেশের পল্লী-স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে। হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে থাকা রোগীদের এই দৃশ্য অত্যন্ত লজ্জাজনক হলেও মানবিক কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের ফিরিয়ে দিতে পারছে না। নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরির চেয়ে বিদ্যমান লজিস্টিক সাপোর্ট, জনবল সংকট দূর করা এবং সেবা কেন্দ্রগুলোর মান উন্নত করার প্রতি সরকারকে নজর দিতে হবে। আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা বর্তমানে কেবল বিদেশের ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’ বা অন্ধ অনুকরণে চলছে, যেখানে কোনো নিজস্ব উদ্ভাবন বা মিশন নেই। জোড়াতালি দিয়ে চলা এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে শতভাগ ক্লিনিক্যাল ও পেশেন্ট-ওরিয়েন্টেড চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *