পুলক চ্যাটার্জি: সংবাদপাড়ার এক নীরব যোদ্ধার বিদায়

লিখতে লিখতে যিনি হয়ে উঠেছিলেন সংবাদ
খবরের পেছনে ছুটেছেন সারাজীবন। মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, অন্যায়, অনিয়ম আর জনজীবনের নানা সংকট তুলে ধরেছেন সংবাদপত্রের পাতায়। অথচ সেই মানুষটির নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়টিই হয়ে গেল সবচেয়ে বেদনাদায়ক এক সংবাদ।
তিনি পুলক চ্যাটার্জি-বরিশালের সাংবাদিকতার অঙ্গনে পরিচিত এক নাম। দীর্ঘ সাংবাদিকজীবনে তিনি কাজ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক যুগান্তর ও সমকাল-এ। সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৯৯ সালে দৈনিক যুগান্তরের বরিশাল ব্যুরোতে জুনিয়র রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। পরবর্তীতে সমকাল প্রকাশের পর সেখানে বরিশাল ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ ১৮ বছরের বেশি সময় সমকালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০২৩ সালের দিকে প্রতিষ্ঠানটি থেকে চাকরি হারানোর পর তাঁর জীবনে নেমে আসে এক কঠিন সময়।
একজন সাংবাদিকের পরিচয় শুধু তাঁর পদবি দিয়ে হয় না। তাঁর পরিচয় তৈরি হয় মাঠে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, সত্য অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে। পুলক চ্যাটার্জির সাংবাদিকজীবনও ছিল তেমনই দীর্ঘ পথচলার গল্প। বরিশালের সংবাদপাড়ায় তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ, সহকর্মীদের কাছে ছিলেন অভিজ্ঞ একজন সংবাদকর্মী।
কিন্তু চাকরি হারানোর পরের সময়টা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, তিনি মানসিক ও আর্থিকভাবে কঠিন সময় পার করছিলেন। শারীরিক অসুস্থতাও তাঁর জীবনে বাড়তি সংকট তৈরি করেছিল।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়-যে সমকাল কার্যালয়ে একসময় তিনি দায়িত্বশীল পদে বসে অসংখ্য সংবাদ সম্পাদনা করেছেন, সংবাদ সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন, সাংবাদিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন, জীবনের শেষ সময়ে সেই অফিসেই তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ যেন সাংবাদিকতার এক নির্মম প্রতীকী দৃশ্য-যে মানুষটি অন্যের গল্প লিখেছেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের গল্পই হয়ে গেল সংবাদপত্রের শিরোনাম।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি সংবাদমাধ্যমের মানুষদের জন্যও গভীর আত্মজিজ্ঞাসার বিষয়। একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকার পর কীভাবে জীবনযাপন করেন? দীর্ঘ সাংবাদিকতা শেষে একজন সংবাদকর্মীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? অসুস্থতা, কর্মহীনতা ও পেশাগত অনিশ্চয়তার সময়ে একজন সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কতটা আছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো আজই পাওয়া যাবে না। কিন্তু পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়া সেই প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করে সামনে এনে দিয়েছে।
তিনি স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বরিশালের সাংবাদিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
একজন সাংবাদিকের জীবন বাইরে থেকে যতটা আলোকিত মনে হয়, তার ভেতরে ততটাই থাকতে পারে অনিশ্চয়তা, চাপ, নিঃসঙ্গতা ও সংগ্রাম। পুলক চ্যাটার্জির জীবন আমাদের সেই অদৃশ্য বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
সংবাদকর্মীরা প্রতিদিন অন্যের অধিকারের কথা বলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেন। মানুষের কষ্টকে শব্দে তুলে ধরেন। কিন্তু তাঁদের নিজেদের কষ্টের কথা কে লিখবে?
পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়ার পর হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই—
যাঁরা সারাজীবন মানুষের গল্প লিখলেন, তাঁদের গল্প শোনার মানুষ কি আমরা হয়ে উঠতে পেরেছি?
পুলক চ্যাটার্জি আর কোনো সংবাদ লিখবেন না। কোনো প্রেস ব্রিফিংয়ে ছুটে যাবেন না। কোনো সহকর্মীকে ফোন করে খবরের সূত্র যাচাই করবেন না। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকজীবন এবং আকস্মিক মৃত্যু সংবাদমাধ্যমের সামনে রেখে গেল কিছু কঠিন প্রশ্ন—যেগুলোর উত্তর খোঁজা এখন জরুরি।
একজন সাংবাদিকের মৃত্যু দিয়ে যেন সেই প্রশ্নগুলোও হারিয়ে না যায়।
পুলক চ্যাটার্জি চলে গেলেন। রেখে গেলেন সাংবাদিকতার মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে নতুন করে ভাবার এক গভীর দায়।

মেয়ের কাছে লেখা চিঠি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *