কী হচ্ছে জঙ্গল সলিমপুরে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুর আবারও আলোচনায় এসেছে। গত কয়েক মাসে যৌথ বাহিনীর অভিযান, সন্ত্রাসী হামলা, সরকারি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই আজ রবিবার (৩১ মে) জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে গেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরিদর্শন শেষে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘জঙ্গল সলিমপুর আর কোনও বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এলাকা বা অভয়ারণ্য হিসেবে থাকবে না। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে পরিচিত। ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন হাজার ১০০ একর আয়তনের এ এলাকায় চার দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে। সরকারি খাসজমিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বসতি, দোকান ও মার্কেট। এ কারণে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‍্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন নিহত হন। ওই ঘটনায় আরও তিন র‍্যাব সদস্য ও একজন সোর্স আহত হন। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা হলেও মূল আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ওই ঘটনার পর যৌথ বাহিনী এলাকায় অভিযান শুরু করে। অভিযানের মুখে সন্ত্রাসীরা জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ হারায়। একই সময়ে সরকার সেখানে পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি, কারাগারসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়।

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। গত ২৪ মে গভীর রাতে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। র‍্যাবের তথ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপ রাত ১টার দিকে ক্যাম্পে হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা নন-লেথাল অস্ত্র ব্যবহার করে জবাব দেয়। প্রায় দুই ঘণ্টা উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলে। পরে যৌথ বাহিনী এলাকায় প্রবেশ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং অভিযান চালায়। তবে ওই ঘটনায় হতাহত বা আটকের কোনও তথ্য জানানো হয়নি।

এই ঘটনার এক সপ্তাহের মাথায় আজ রবিবার (৩১ মে) জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে গেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দেশে কার্যকরভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস যারা দেখিয়েছে, তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে। জঙ্গল সলিমপুর, আলীনগর ও আশপাশের এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভেতরে এক ধরনের দুর্বৃত্তের কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল, যার একটি উদাহরণ জঙ্গল সলিমপুর। সন্ত্রাসীরা এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা ও সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিল। তবে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সেই নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যদিও তথ্য ফাঁসসহ কিছু কারণে অভিযানের লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করা যায়নি।

র‌্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্পে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর পেছনে থাকা ভূমিদস্যু ও ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও বোয়ালখালীসহ বিভিন্ন এলাকার সন্ত্রাসীদের তালিকা ও আস্তানা চিহ্নিত করে সমন্বিত পরিকল্পনায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলাকারীদের কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।

একই সঙ্গে জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, এলাকায় পরিকল্পিত সরকারি স্থাপনা ও একাডেমি নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগার বায়েজিদ লিংক রোড-সংলগ্ন এলাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারা অধিদফতর প্রথমে নির্ধারিত স্থান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করবে।

এছাড়া জঙ্গল সলিমপুরে আধুনিক সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমানে সেখানে বসবাসরত কাউকে আপাতত উচ্ছেদ করা হবে না। প্রকৃত বাসিন্দাদের জন্য পুনর্বাসনের একটি টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া হবে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরে এখন একদিকে চলছে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান, অন্যদিকে এলাকাটিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা অভিযানের পর এলাকাটিকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং সরকারের নজর আরও বেড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *