জ্বালানি সংকটের ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্পে: ডিসিসিআই

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৬১০ বিলিয়ন টাকা বাড়তে পারে। একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থাপিত বিশ্লেষণে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। ‘বৈশ্বিক জ্বালানী সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান  জালাল আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো হরমুজ প্রণালি। প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় এই রুটে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে এবং অনেক বিমা কোম্পানি যুদ্ধ ঝুঁকির বিমা প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে দাম দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে লোহিত সাগর ও হরমুজ অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৃহৎ তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ভাড়া প্রায় ৩২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি চার দশমিক সাত শতাংশ থেকে কমে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একইসঙ্গে জ্বালানি দামের উল্লম্ফনে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত: নির্ভরতা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় একটি দুর্বলতা হলো আমদানি নির্ভরতা। দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতার প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের জ্বালানি খাতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে— ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ, গ্যাসের দাম ২০২৩ সালের পর থেকে বেড়েছে প্রায় ১৭৯ শতাংশ ও এলপিজি গ্যাসের দাম বেড়েছে ১২৫ শতাংশ। ফলে নিম্ন আয়ের প্রায় তিন কোটি পরিবারের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে প্রতি মাসে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

বৈদেশিক মুদ্রা ও বাজেটে চাপ

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে—তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়। জ্বালানি আমদানির জন্য বছরে অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এলএনজি ও জ্বালানিতে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে এবং বাজেট ঘাটতিও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি তিন দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হবে।

শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত

জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্প উৎপাদনে। বিশেষ করে জ্বালানি নির্ভর শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক পোশাক শিল্প কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্পে। সিমেন্টের প্রতি ব্যাগের দাম ইতোমধ্যে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া ফার্মাসিউটিক্যাল খাতেও প্রভাব পড়েছে। উৎপাদনের কাঁচামাল ও প্যাকেজিং খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্যাকেজিং উপকরণের দাম ৭০০ ডলার থেকে বেড়ে ১৮০০ ডলার পর্যন্ত হয়েছে।

কৃষি ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ

জ্বালানি সংকট শুধু শিল্পেই নয়, কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনেও বড় প্রভাব ফেলছে। সেচে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
সার আমদানির খরচ বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এছাড়া শহরের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ জ্বালানি ব্যয়ে খরচ করছে।

সরকার কী করছে

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—জ্বালানি ভর্তুকি বাড়ানো, অফিস সময় কমানো ও আগেভাগে বাজার বন্ধের নির্দেশ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এয়ার কন্ডিশনার ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখার নির্দেশ ও চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো। এছাড়া বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অস্থায়ী পদক্ষেপে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ জরুরি।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্ববাজারে জ্বালানি অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কৌশলগত সিদ্ধান্ত না নিলে জ্বালানি সংকট অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসে বিনিয়োগ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *