বাংলাদেশে এক অর্থবছরে আয়কর খাতে দেওয়া করছাড়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৩৯ শতাংশের সমান। অর্থাৎ বর্তমানে প্রত্যক্ষ কর থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে, প্রায় তার সমপরিমাণ করছাড় বিভিন্ন খাতে দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেওয়া আয়কর অব্যাহতি ও করছাড়ের বিস্তারিত হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট করছাড়ের বড় অংশই গেছে করপোরেট খাতে। এক অর্থবছরে করপোরেট আয়করে ছাড় দেওয়া হয়েছে ৭৩ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা, যা মোট করছাড়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ। অপরদিকে ব্যক্তি পর্যায়ের আয়করে করছাড় দেওয়া হয়েছে ৩৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, যা মোট করছাড়ের প্রায় ৩১ শতাংশ।
করপোরেট খাতেই সবচেয়ে বেশি সুবিধা
এনবিআরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, করপোরেট করের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করছাড় পেয়েছে ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক কল্যাণমূলক খাত। এসব খাতে বছরে করছাড়ের পরিমাণ ১২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা।
এরপর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে করছাড় দেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। মূলধনি আয় খাতে ছাড়ের পরিমাণ ৭ হাজার ৭১ কোটি টাকা এবং তৈরি পোশাক শিল্প পেয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার কর সুবিধা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরে করপ্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।
ব্যক্তি পর্যায়ে বেতন আয়ে বেশি ছাড়
ব্যক্তিগত করদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করছাড় দেওয়া হয়েছে বেতনভিত্তিক আয়ের ক্ষেত্রে। এই খাতে করছাড়ের পরিমাণ ৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া পোলট্রি ও মাছ চাষ খাতে জড়িত ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকার করছাড়। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে করছাড় দেওয়া হয়েছে প্রায় ৮১৭ কোটি টাকা।
করছাড় নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবছর বিভিন্ন খাতে করছাড় দেওয়া হলেও এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকের অভিযোগ, প্রভাবশালী গোষ্ঠী এসব করছাড়ের সুবিধা বেশি পায়। ফলে সরকারের প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ কমে যায়।
অপরদিকে তৈরি পোশাকসহ কিছু শিল্প খাত করছাড়ের মাধ্যমে দ্রুত বিকাশ লাভ করলেও এখনো এসব খাতে একই মাত্রায় করসুবিধা রাখা প্রয়োজন কি না— সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
আইএমএফ’র শর্তে কর-ছাড় কমানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো করছাড় ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা। সেই প্রেক্ষাপটেই এনবিআর প্রথমবারের মতো বিভিন্ন খাতে দেওয়া করছাড়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করেছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে উৎসাহিত করতে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। এতে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ে। যদিও এতে সাময়িকভাবে রাজস্ব ক্ষতি হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করে।
সংস্কারের সুপারিশ
প্রতিবেদনে করপ্রণোদনা ব্যবস্থায় সংস্কারেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এতে অপ্রয়োজনীয় কর-ছাড় ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি রফতানি বহুমুখীকরণ, সবুজ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) উন্নয়ন, লিঙ্গসমতা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের মতো জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে করপ্রণোদনা সামঞ্জস্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের মতে, এ ধরনের সংস্কার কার্যকর করা গেলে করহার না বাড়িয়েও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব হবে এবং কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও জোরদার হবে।