তেল-এলএনজির দাম বাড়লে চাপে পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)–এর দাম বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি-রফতানি হ্রাস, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সানেম এই বিশ্লেষণ তুলে ধরে।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়নে গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্টের কম্পিউটেবল জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম (সিজিই) মডেল ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তেলের দাম ৪০ শতাংশ ও এলএনজি ৫০ শতাংশ বাড়লে সম্ভাব্য প্রভাব

সানেমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি ব্যয়ের ধাক্কা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্পষ্ট প্রভাব ফেলবে।

এ ক্ষেত্রে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রফতানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি প্রায় দেড় শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।

এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়বে। ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।

সানেম আরও বলছে, হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর দেশের উচ্চমাত্রার নির্ভরশীলতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৭২ শতাংশ কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সানেম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব পড়ার তিনটি প্রধান চ্যানেল চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো— জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ (রেমিট্যান্স), বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জ্বালানি রেশনিংয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিয়ে সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কিছু অমিল দেখা যাচ্ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সানেমের সুপারিশ

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে সরকারকে কয়েকটি সুপারিশ করেছে সানেম। এর মধ্যে রয়েছে— জমি ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সহজলভ্য ও কার্যকর উৎসের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। আসন্ন জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা। করমুক্ত জ্বালানি সরঞ্জাম, স্বল্প সুদের ঋণসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ। স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং বহুজাতিক ও দ্বিপক্ষীয় জ্বালানি চুক্তি বাড়ানো। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও এলএনজির জন্য কৌশলগত জাতীয় মজুত (স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ) গড়ে তোলা।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ডিজিটাল কিউআর কোডভিত্তিক জ্বালানি রেশনিং, শিল্প উৎপাদন অফ-পিক সময়ে স্থানান্তর এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সময়সীমা সীমিত করা।

সানেমের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। এতে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ঝুঁকি কমিয়ে অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *