যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ‘আলোচনা’ কীভাবে নেবে ইসরায়েল

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির পর ইসরায়েলে একধরনের হতাশা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ভয়াবহ হামলার হুমকি এবং তেহরানের পক্ষ থেকে আলোচনার খবর অস্বীকার করার মধ্যেই ট্রাম্পের এমন দাবি সামনে এসেছে।

পুরো যুদ্ধে ইসরায়েলি নেতারা নিজেরা ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সম্মুখভাগে থাকার কথা বলে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রায়ই গর্ব করে বলেন, ইসরায়েলের জন্য ইরানের তৈরি করা ‘অস্তিত্বের সংকট’ মোকাবিলায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে শামিল করতে সক্ষম হয়েছেন।

ইরানের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে সোমবার ট্রাম্পের মন্তব্যের পর এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করেন, ‘ইসরায়েলি ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর অর্জিত বিশাল সাফল্য একটি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে কাজে লাগানো সম্ভব…যা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থগুলো রক্ষা করবে।’

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এর পাশাপাশি আমরা ইরান ও লেবানন উভয় স্থানেই হামলা অব্যাহত রেখেছি। আমরা খুবই দক্ষতার সঙ্গে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করছি এবং হিজবুল্লাহর ওপর জোরালো আঘাত হানা অব্যাহত রেখেছি।’

ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা প্রবল ছিল যে এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটবে এবং দেশটির হুমকি চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ইরানের সরকার এখনো টিকে থাকায় এবং গত কয়েক দিনে ইসরায়েলে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার প্রেক্ষাপটে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষের বিষয়টি অনেককেই বিচলিত করছে।

ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিনকাস আল–জাজিরাকে বলেন, নেতানিয়াহুর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প যদি আলোচনার পথে হাঁটেন, তবে সেটি হবে একধরনের বার্তা। আর সেই বার্তাটি হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুঝতে পেরেছেন, ‘নেতানিয়াহু হয়তো দ্রুত ও বিশাল বিজয় এবং সরকার পরিবর্তনের জোরালো সম্ভাবনার কথা বলে তাঁকে বিভ্রান্ত করেছেন।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, আলোচনার বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে আগে থেকে কোনো পরামর্শ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়ানোর যে চেষ্টা নেতানিয়াহু করেছিলেন, তার চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান।

তেল আবিব থেকে আল–জাজিরাকে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ‘এটি কি নেতানিয়াহুর পরাজয়? অবশ্যই! ট্রাম্প মূলত ইসরায়েলকে এক পাশে সরিয়ে রেখেছেন। আপাতত আমরা হয়তো লেবানন ধ্বংস করা বা গাজাকে অভুক্ত রাখার কাজটি চালিয়ে নিতে পারব, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশ গুরুত্ব দিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করবে, সেই চিন্তভাবনা এখন অতীত। আমাদের সঙ্গে কেউ কথা বলতে চায় না।’

লক্ষ্য কি অর্জিত হয়েছে

নেতানিয়াহু এবং তাঁর কট্টর ডানপন্থী ইসরায়েলি মিত্ররা ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়কে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী উদ্‌যাপন করেছিলেন। ট্রাম্পের বিজয়কে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারত্বের এক নতুন অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেছিলেন তিনি।

তবে ট্রাম্পের হুটহাট সিন্ধান্ত বদলের স্বভাব এবং দুই দেশের মধ্যে ক্ষমতার বিশাল ভারসাম্যহীনতা বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন ২০২৫ সালের শেষের দিকে গাজায় ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দেওয়া এবং ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর ইসরায়েলের আগেরবার চালানো হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ইসরায়েলি রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল প্রভাবের কারণে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, বর্তমান আলোচনায় ইসরায়েল কোণঠাসা হয়ে পড়লেও ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের অর্জনগুলো ফিকে হয়ে যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *